প্রবন্ধ-নিবন্ধ

কালান্তরের ধুমকেতু নজরুলের প্রতিভা ও নজরুলে ট্র্যাজিডি
ড. মাহফুজ পারভেজ

১.
অবিভক্ত বাংলার প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত জনপদ চুরুলিয়া গ্রামের আক্ষরিক অর্থেই একটি মাটির ঘরে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল এবং দুঃখ, দারিদ্র্য ও কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাহিত্যসাধনার সকল শাখায় তুঙ্গস্পর্শী সাফল্য ও জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত বেদনার নির্বাক জীবন-যাপন শেষে দুখুমিয়া নামের শিশুটি এখন ঘুমিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিয় মসজিদের পাশে- তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জন্ম ছিল একটি নিদ্রিত জাতির মধ্যে মহাজাগরণের ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রবল উত্থানে প্রকম্পিত। নজরুল নিজের একটি গানে যেন সে আবহের জানান দিচ্ছেন:
“বাজল কি রে ভোরের সানাই নিদ মহলার আঁধারপুরে,
শুনছি আজান গগন তলে অতীত রাতের মিনার চূড়ে।”
নজরুল বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম ‘সৃষ্টির ভুবনে নজরুল স্বাধীন সম্রাট’ প্রবন্ধে (দেশ, ১২ জুন ১৯৯৯) লিখেছেন:
“ফজরের আজানে ‘নিদ্রা অপেক্ষা প্রার্থনা (নামায) শ্রেয়’ এই কথা বলা হয়ে থাকে অর্থাৎ জাগরণের আহ্বান থাকে। বাঙালি মুসলমান সমাজে নজরুল ইসলামের জন্ম বাঙালি মুসলমান সমাজের জাগরণের সূচক।”
শতবর্ষ আগে, একই বছরে (১৮৯৯), একই দেশে, একই ভাষার পরিমণ্ডলে, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে জন্ম নেন নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ। তবু নজরুল ও জীবনানন্দ কবিতায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হলেন কী করে ? শুধু পরিবেশের ভিন্নতা? পরিবেশ,  ধর্ম, সংস্কৃতি, চিন্তা, দর্শন, জীবনবোধ কিংবা প্রতিভার রহস্যময়তায় এ ভিন্নতা চি‎িহ্নত করা সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও নজরুলে বৈশিষ্ট্যগত সুস্পষ্ট পার্থক্য কারও কাছেই অনুভব ও বিবেচনার বাইরে থাকে না। সব কিছুকে ছাপিয়ে রুদ্র কাল বোশেখীর মতো দুর্দণ্ড প্রতাপে নজরুল এক ও অনন্য  একটি বিশাল ধূমকেতুর হয়ে সমগ্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে, এমন কি সমাজ-সংসার আর রাজনৈতিক ইতিহাসকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে যান। মৃত্তিকালগ্নী গৃহ থেকে মহাকাশের ধূমকেতুর অস্তিত্বে মহাকালব্যাপী প্রসারিত হওয়া নজরুলের পক্ষেই সম্ভব; যদিও এমন ঘটনা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি বা বিশ্ব ইতিহাসেও অসম্ভব।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘দুই কবি: দুই বিপরীত মেরুর প্রতিভূ’ প্রবন্ধে (দেশ, ১২ জুন ১৯৯৯) বলছেন:
“প্রতিভার বিচারে নজরুল অনেক বেশি উজ্জ্বল। তাঁকে রীতিমতন প্রডিজি বলা যেতে পারে। মাত্র বারো-তেরো বছর বয়সে বালক নজরুল লেটোর দলের জন্য গান ও পালা রচনা করতেন। অত কম বয়স, ক্লাস সিক্স পর্যন্ত বিদ্যে, তাঁর গান ও পালার জন্য পয়সা পর্যন্ত পেতেন, এটা বিস্ময়কর নয়! প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের মক্তবে, মসজিদ সংলগ্ন পরিবারের সন্তান, তাঁদের ব্যবহারিক ভাষাকে বলা হত ‘মুসলমানি বাংলা’, তাতে আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ ছিল স্বাভাবিক, তবু ওই অবস্থাতেই নজরুল বাংলা কবিতার ছন্দ-মিল আয়ত্ত করেছিলেন, এমন কি ইংরেজি শব্দও ইচ্ছেমতন ঢুকিয়েছিলেন।”
প্রতিভার সঙ্গে নজরুলের ছিল সাহসী ও বিদ্রোহী মন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একই প্রবন্ধে জানিয়েছেন:
“... সৈন্যদলে যোগ দিতে পাড়ি দিলেন করাচি। তাঁর সহপাঠী বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সৈন্যবাহিনীতে যেতে পারেন নি, হিন্দু মধ্যবিত্ত বাঙালি মানসিকতায় তাঁর পারিবারিক বাধা ছিল, কিন্তু নজরুল সেই মানসিকতা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।”
নজরুলের দৃপ্ত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় করাচি সেনানিবাসে রচিত ‘ বাঁধন হারা’য়: 
“আগুন, ঝড়, ঝঞ্ঝা, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ, বজ্র, আঘাত, বেদনাÑএই অষ্টধাতু দিয়ে আমার জীবন তৈরি হচ্ছে, যা হবে দুর্ভেদ্য, মৃতুঞ্জয়, অবিনাশী। আমার পথ শাশ্বত সত্যের পথ, বিশ্বমানবের জনম জনম ধরে চাওয়া পথ, আমি আমার আমিত্বকে এ পথ থেকে মুখ ফেরাতে দেব না।” 
এমনই প্রবল বিদ্রোহ ও তীব্র সাহসে নজরুল ছিন্ন করেন তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের সাংস্কৃতিক দাসত্ব এবং রাজনৈতিক পরাধীনতার শৃঙ্খল। নিম্নবর্গের মেহনতি মানুষ ও স্বজাতির আত্মজাগরণের  মূলস্রোতে তিনি কবিতা, গান, লোকনাট্য, কথাশিল্পকে  বেগবতীভাবে প্রবাহিত করে পরিণত হন জাতির স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার সাহিত্য স্রষ্টায়। দীর্ঘ জীবনের মাত্র সামান্য কিছু কর্মময় কালেই তিনি তুলনায় ছাড়িয়ে যান আর সবাইকে; পরিণত হন নিজেই নিজের অনন্য উপমায়। আজকের বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও স্বপ্ন, বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতা ও সংগ্রামশীলতা, সর্বপরাধীনতা থেকে রাষ্ট্র ও মানুষের সাংস্কৃতিক-আত্মিক-রাজনৈতিক মুক্তির কথা আমাদের কাছে, আমাদের জন্য, নজরুল ছাড়া আর কেউ এতো সাহসের সঙ্গে স্পষ্টভাবে বলতে পারেন নি; নজরুল ভিন্ন আর কেউই তা-ই আজকের বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জাতিসত্ত্বার এতোটা কাছে এসে স্বজনের সহৃদয়তায় দাঁড়াতে পারেন নি; নজরুল ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের জাতীয় কবির স্বীকৃতি দাবি বা প্রত্যাশাও করতে পারেন নি। ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও জীবনবোধে নজরুল যতটুকু আমাদের, আর কেউ ততটুকু আমাদের হতে পারেন নি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আর সকলের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনায় আমাদের সঙ্গে নজরুলের সর্বাঙ্গীন সম্পর্ক, নিবিড় ঘনিষ্টতা, ঐতিহ্যবাহিত উত্তরাধিকার এবং আত্মা ও শরীরের একাত্মতাই প্রথম আর প্রধান সত্য।

২.
নজরুল বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সে। ছিলেন মাত্র দুই বছর। সেখানেই তাঁর আনুষ্ঠানিক সাহিত্যজীবনের সূচনা। করাচি থেকে ডাকযোগে তিনি কলকাতার পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠাতে থাকেন। পত্র-পত্রিকার সংখ্যা তখন খুব বেশি ছিল না। তবে যেটা খুব বেশি ছিল, তা হলো প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোতে লেখা ছাপানোর ক্ষেত্রে জাত, পাত, ধর্ম-বিশ্বাসের বিবেচনাকে এবং অনুগত-বশংবদদের সামনে আনার সম্পাদকীয় প্রবণতা। (এখনও এই অন্ধত্ব, মূর্খতা ও আদিম গোত্রীয় মনোভাব লুপ্ত হয় নি!) সে সময়ের প্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যচর্চা মুসলমানদের জন্য সাদর ও প্রীতিপূর্ণ ছিল না। সাহায্যকারীর চেয়ে বিরোধীর সংখ্যা ছিল অধিক।  সকল ক্ষুদ্রতাকে পদানত করে নজরুল অবিরাম লিখতে থাকেন এবং পত্রিকাগুলোও সেসব ছাপাতে বাধ্য হয়। মাত্র কুড়ি বছর বয়সের মধ্যে তাঁর অনেকগুলো গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ছাপা হয়ে যায়। দুটি পত্রিকা তাঁর রচনা প্রকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একটি ‘মাসিক সওগাত’ আর অন্যটি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’। যুদ্ধ শেষে নজরুল করাচি-পর্ব শেষে সব কিছু নিয়ে কলকাতায় এসে উঠলেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে। সেই একুশ বছর বয়সেই তাঁর লেখার যথেষ্ট চাহিদা। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর উপন্যাস ‘বাঁধন হারা’। এরপর কলকাতায় তাঁর ঠিকানা হলো তালতলা এলাকার ভাড়া বাসাÑনজরুলের স্মৃতির স্পর্শে যা ঐতিহাসিক মর্যাদায় ভূষিত। কারণ এখানেই তিনি মাত্র একুশ-বাইশ বৎসর বয়সে এক রাত্রির মধ্যে নজরুল লিখে ফেলেন ‘বিদ্রোহী’ নামের একটি দীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক কবিতা। 
প্রায় একটি অবিশ্বাস্য, অলৌকিক কাণ্ড। এ কী শব্দ নির্মিত কবিতা, না অনাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিজয়ীর কামান! অবদমিত, ষড়যন্ত্র ও হিংসায় আক্রান্ত, আত্মবিস্মৃতি জাতিকে আগে কেউ বলে নি, ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’। ঘুমন্ত, বিভ্রান্ত, পথভোলা জাতি নজরুলের উদাত্ত আহ্বান শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো। নজরুলের রাজনৈতিক চেতনা ও বিশ্বাস দ্বিধাহীন ও অকপট। পরাধীনতার চেতনা থেকে মুক্তির জন্য ইংরেজ শাসক ও তাদের দোসরদের কাছে আবেদন নিবেদনের বদলে তেজের সঙ্গে গর্জে ওঠেছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা ও জাতির মুক্তির জন্য।এই বিষয়গুলো কিংবা আর্থ-রাজনৈতিক সকল বিষয়ে এত স্পষ্ট ও সোচ্চারভাবে আগে আর কেউ লিখেন নি; বলেন নি। বাঙালী মুসলমান সমাজকে হৃত গৌরবের-স্বাধীনতার পথে জাগিয়ে দিতে সেই সময়ে এই রকম একজন সাংস্কৃতিক নেতার প্রয়োজন ছিল। বাঙালি হিন্দু সমাজ রাম মোহনকে পেয়েছিলেন, বঙ্কিমকে পেয়েছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র, মাইকেল, এমন কি রবীন্দ্রনাথকেও। কলকাতাকেন্দ্রীক নবজাগরণে বাঙালি হিন্দু সমাজ জেগে ওঠেছিল ধর্ম, দর্শন, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বিশিষ্টতায় ও চৈতন্যে। তাঁদের সেই সাফল্য তো বাঙালি মুসলমানকে স্পর্শ করে নি। হায়! তখন পর্যন্ত বাঙালিত্বের পুরোধা হিন্দু সমাজ এটাই ঠিক করতে পারে নি যে, মুসলমানদেরকে বাঙালিরূপে গ্রাহ্য করা যায় কিনা! অগ্রসর বাঙালি হিন্দু সমাজ, তাঁদের ধ্র“বতারারা, এমন কি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত যা পারেন নি, সেটা করলেন নজরুল ? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সূত্রে জানাই:
“রবীন্দ্রনাথ বা অন্যান্য কবিরা যা পারেন নি, নজরুল সরাসরি পৌঁছে গেছেন জনগণের কাছে। রবীন্দ্রনাথ খুবই রাজনীতি ও সমাজ সচেতন ছিলেন, কিন্তু সেসব বিষয়ে তিনি লিখেছেন নিজস্ব ভাষায়, যা আম জনতার ভাষা নয়। কিন্তু তাঁর সমসাময়িক এবং পরবর্তী বেশির ভাগ লেখকের মধ্যেই এই সচেতনতা বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত। জীবনানন্দ দাশের কোনও লেখা পড়ে বোঝারই উপায় নেই যে দেশটা পরাধীন। কবি বা ঔপন্যাসিক বা সঙ্গীতকার বা সাংবাদিক বা স্বদেশচিন্তকগণের মধ্যে সমকালে একমাত্র ইংরেজের জেল খেটেছেন নজরুল।”

৩.
নজরুলের সাহিত্যজীবন মোটামুটি মাত্র বাইশ বছর। তার মধ্যেও প্রথম দশ বছরেই তিনি তাঁর অধিকাংশ বিখ্যাত রচনাগুলো লিখে ফেলেন। গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন গীতিকার ও সুরকার। রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনে যত গান লিখেছেন, নজরুল মাত্র আট-দশ বছরের মধ্যে সঙ্গীত সৃষ্টি করেছেন তারচেয়ে বহু বেশি। নজরুলের গানের সংখ্যা তিন হাজারের কাছাকাছি! ‘ধুমকেতু’ পত্রিকাকে অবলম্বন করে নজরুল অনেক কাজ করেছেন। ‘ধুমকেতু’ নামে কবিতাও লিখেছেন। ধুমকেতু শব্দটি তাঁর অতি প্রিয় ছিল। নিজেকে ধুমকেতুর সঙ্গে তুলনা দিতে ভালোবাসতেন তিনি। অকালে রুদ্ধ হয়ে লেখালেখি বন্ধ করতে হয়েছিল তাঁকে। চরম অসুস্থ হওয়ার অনেক আগেই তিনি কবিতা রচনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন; কখনও লিখেও ছিড়ে ফেলেছেন। ১৯৩৬ সালে জসীমউদ্দীনকে একটি চিঠিতে লিখেছেন: “আমি সাহিত্যলোক থেকে যাবজ্জীবন নির্বাসন দণ্ড গ্রহণ করেছি।”
নজরুল কী নিজেই জানতেন লেখালেখির জগৎ থেকে তাঁকে বিদায় নিতে হবে ? কেন এই বিদায়, তা তিনি বলে যান নি। ১৯২৯ সালে আজিজুল হাকিমকে একটি চিঠিতে কেবল আভাস দিয়েছেন: “আমি এসেছি হঠাৎ ধুমকেতুর মত, হয়ত চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল।” কাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিলেন তিনি ? তারা কী জানে, কেন নজরুলকে অসময়ে রুদ্ধ হয়ে যেতে হলো ?
‘জলপ্রপাতের অন্তর্লীন বিষাদ’ শীর্ষক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে:
“১৯৪৩ সালে নজরুল ও তাঁর পরিবারকে সাহায্য করতে একটি প্রকাশ্য কমিটি হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। সম্পাদক সজনীকান্ত দাশ। ১৯৫২ সালে নজরুল নিরাময় সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতি কবিকে প্রথমে চারমাস রাঁচিতে রেখে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে দেখান। তারপর তাঁকে ইউরোপ পাঠানো হয় ১৯৫৩ সালের মে মাসে। দেশে ও বিদেশে তাঁকে চিকিৎসার সময় বিধানচন্দ্র (পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা) কবিকে আগাগোড়াই ডাক্তার হিসাবে দেখেন। বিধানচন্দ্র ভিয়েনা গিয়েছিলেন তখন। সেখানেও তিনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নজরুলের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র ও রিপোর্ট নিয়ে কথা বলেন। ততদিনে কবির আরোগ্য লাভের সব রাস্তা ফুরিয়ে গেছে।”
নজরুলের সংবিৎহারা অবস্থার আগে বা পরে নজরুলকে নিয়ে যা কিছু করা হয়েছে তার সঙ্গে নজরুলের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু এ কথাটিই চিরসত্য যে, কোনও অবস্থাতেই তিনি দখলদার ইংরেজ সরকারের তাবেদারি করেন নি; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পাণ্ডাদেরকে সমঝে চলেন নি; প্রতিষ্ঠিত গোত্র বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পক্ষপুটে আশ্রয় নেন নি। শুরু থেকে শেষতক পর্যন্ত তিনি স্বজাতির কবি ছিলেন; মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন; জাত-পাত-ক্ষুদ্রতার বিরোধী ও বিনাশী ছিলেন। ইতিহাসকার বিপিন পালও স্বীকার করেছেন যে, “নজরুলের শিকড় ছিল দেশজ সংস্কৃতির মাটিতে।” সেই দেশটিই আজকের বাংলাদেশ। 
ঐতিহাসিক লাডলীমোহন রায়চৌধুরী ‘সাম্যবাদী আদর্শ প্রচারে অন্যতম পথিকৃৎ-কবি’ শিরোনামে লিখিত এক গবেষণায় জানাচ্ছেন: 
“কলকাতার হরফ প্রকাশনী নজরুলের যে গানের সঙ্কলন গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল তার এক জায়গায় লেখা আছে যে নজরুল নাকি শোকে-তাপে এমনই ভেঙে পড়েছিলেন যে শেষের দিকে তিনি স্বীকার করে যান যে আল্লাহ ছাড়া তাঁর জীবনে কামনা করার আর কিছুই নেই। এই উক্তির মধ্যে তাঁর জীবনের দুঃখ বিড়ম্বিত অশান্ত মনের অবস্থা ব্যক্ত হয়েছে। জীবনের শুরুতে তিনি নিজের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে যাই পদচি‎হ্ন’। আর জীবন সায়া‎েহ্ন এসে সেই একই মানুষ নানা ধরনের শ্যামাসঙ্গীত গানের পালা শেষ করে কবুল করলেন যে আল্লাহ ছাড়া তাঁর আর কিছু চাইবার নেই।”  
কালান্তরের ধুমকেতুর মতো নজরুলের প্রতিভা আর নজরুলের ট্র্যাজিডি সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে ঘিরে রেখেছে।

----------------
তুমি কাদের কবি?
পবিত্র সরকার

মনে পড়ে, সেটা ১৯৫৭ সাল বা ওরই কাছাকাছি হবে, কলেজের বাংলা অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র, আমরা একবার নজরুলকে তার কলকাতার সিআইটি রোডের ছোট্ট ফ্ল্যাটে দেখতে গিয়েছিলাম। আমার বয়োজ্যেষ্ঠ ভাগিনেয় প্রয়াত রমেন দাসের সঙ্গে, রমেন তখন কলকাতার ‘লোক সেবক’ পত্রিকার ছোটদের পাতা পরিচালনা করত। নজরুল তাকে চিনতেন, তার কাছে নজরুলের নিজের হাতের লেখা ‘চল চল চল’ গানের একটি কপিও ছিল, সে সেটা তার বসবার ঘরে বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রেখেছিল। জন্মদিনে নজরুলকে ফুল দিয়ে আসা ছিল তার বাৎসরিক কর্তব্য। তাই সেবার আমরা তার সঙ্গী হলাম।
সেদিনটা ছিল কবির জন্মদিন। আমরা গিয়ে প্রণাম করে এক কোণে গিয়ে বসলাম- ওই ছোট্ট ঘরে খুব বেশি লোকের বসার জায়গা নেই, লোকের আসা-যাওয়ার মধ্যেও ভিড়ে ঠাসা থাকছে ঘর। প্রমীলার মাথার উপর সিলিঙে একটি ফ্যান ঘুরছে, কবির পাশেও একটি ছোটো টেবিল ফ্যান রাখা আছে। তবু তার স্বজনদের বা ভক্তদের দু-একজন হাতপাখা নিয়ে কবিকে বাতাস করছেন। কবি তখন প্রায় ১৫ বছর বাকশক্তিহীন, লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরে মেঝেতে বসে আছেন। তার সামনে একটি হারমোনিয়াম রাখা। পেছনে একটি খাটে স্ত্রী প্রমীলার জড়প্রায় দেহ শায়িত, কিন্তু তিনি সবই লক্ষ্য করছেন, কখনওবা ক্লান্ত হয়ে চোখ বুঝছেন। নজরুলের দৃষ্টি শূন্যতায় ভরা, মনে হয় তার সব কথা ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু তার সামনে আমরা যে ফুল রাখছি, তার স্বজনরা তা গ্রহণ করে সাজিয়ে রাখছেন, তা তার ভালো লাগছে মনে হয়। চোখ দুটি একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, ঠোঁট দুটি কাঁপছে, কিছু বলবার চেষ্টা করছেন বলে যেন। কখনও পাশে রাখা ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে ফুলের গায়ে হাত বোলাচ্ছেন, তাতে ফুলের পাপড়ি খসে পড়ছে দু-একটি। নজরুলগীতির বিশিষ্ট শিল্পীরা আসছেন প্রণাম করতে, প্রণাম করে হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে গান গাইছে, ‘অঞ্জলি লহো মোর’, কিংবা ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’- কবি যেন অস্থির হয়ে উঠছেন, নিজেও গাইবার চেষ্টা করছেন হয়তো, শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, মুখ দিয়ে অস্ফুট কাতরোক্তির মতো কিছু শব্দ নির্গত হচ্ছে।

এ দৃশ্য দেখে আমাদের গলায় কান্নার মতো কী একটা ঠেলে ঠেলে উঠছিল। এই কি সেই নজরুল? যে কবিকে আমরা যৌবন, বিদ্রোহ আর বসন্তের দূত হিসেবে ভেবে এসেছি যখন থেকে তার কবিতা পড়েছি তখন থেকে, যে কবির কবিতা আমাদের অপরিমেয় জীবন দিয়েছে, যিনি আমাদের দিনবদলের স্বপ্নে দীক্ষা দিয়েছেন, যার কবিতা পড়ে আমরা পীড়ন, বঞ্চনা আর অসাম্যকে অভিশাপ দিতে শিখেছি, তার বিরুদ্ধে লড়াই করার সঙ্কল্প নিয়েছি, কে সেই মানুষের জীবনকে চৈতন্যকে এমন করে হরণ করে নিল। মনে হলো প্রকৃতির এ বড়ো অবিচার, মানুষের জগতের নিয়মের মধ্যে কোনো একটা গভীর অসঙ্গতি আছে কোথাও-নইলে তো এমন হওয়ার কথা নয়। নজরুলের এ ছবিটাকে কেমন করে মেনে নেব আমরা। মনেই হলো তার সব উচ্চারণের বিরুদ্ধে তার এ পার্থিব জীবন একটা বিপরীত ছবি নির্মাণ করছে। আমি অলৌকিক কোনো কার্যকারণ মানি না, কিন্তু খুব কম স্রষ্টার ক্ষেত্রেই এ বৈপরীত্য দেখা গেছে। সঙ্গীত স্রষ্টা বেটোফেন শেষ জীবনে বধির হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তবু তার সুর সৃষ্টির ক্ষমতা লুপ্ত হয়নি। কিন্তু নজরুলকে এ কী দেখছি আমরা। নিজের প্রবল জীবন্ত অস্তিত্বের এক ধ্বংসাবশেষ মাত্র। জানতাম তার জীবনের ঘটনা, তবু সেদিনের সেই চাক্ষুষ দেখার আঘাত আজ পর্যন্ত ভুলতে পারিনি। 

২.
শেষ পর্যন্ত এ কথাটাই মেনে নিয়েছিলাম যে, এই নজরুল কিছুটা অলীক, আর এক মায়াবিগ্রহ, যে নজরুল বিপুলভাবে জীবন্ত ও সৃষ্টিশীল ছিলেন সেই নজরুল আমাদের কাছে অনেক বেশি সত্য। এই নজরুল একদিন মাটিতে বিলীন হয়ে যাবেন, কিন্তু সেই সত্য নজরুল বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। রবীন্দ্রনাথ ‘স্মরণ’-এ যেমন বলেছিলেন, বেঁচে থাকটাই সত্য, মৃত্যুটা ক্ষণিক ও আকস্মিক, তাই সে পুরোপুরি সত্য নয়, অন্তত জীবনের, কর্মের আর সৃষ্টির ব্যাপ্ত সত্তাকে সে কোনোভাবেই আচ্ছন্ন করতে পারে না। আর তার সৃষ্টিও রইল, হোরেসের কথা অনুসারে ‘জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু শিল্প অনন্ত’ এই কথা প্রমাণ করে। সেই মৃত্যুঞ্জয়, জরাজীর্ণতাবিহীন নজরুলকে আমরা প্রতিদিন পাই, প্রতিদিন গ্রহণ করি।

কোন নজরুল আছেন আমাদের সঙ্গে? যে নজরুলকে আমরা কৈশোর-যৌবনে পূজা করেছি, যার দৃপ্ত পৌরুষের উচ্চারণ আমরা এখনও ভুলতে পারি না, তিনি সেই ‘বিদ্রোহী’ কবি-এ বিশেষণটি তার নামের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তার যে আত্মপ্রকাশ, সেই বলিষ্ঠ, উদ্দাম আত্মঘোষণার তুলনা নেই। আমরা জানি, রোমান্টিক আদলের মধ্যে যারা কবিতাসৃষ্টি করেন, তারা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পূজারি, আত্মতা বা ‘ইগো’-কে তারা প্রাধান্য দেন। আমেরিকান কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘Song of the Self-Song of the Self’-এর মধ্যে নিশ্চয়ই এ দাপট ছিল, কিন্তু তার গদ্য-উচ্চারণের সেই শক্তিকে স্বীকার করেও বলি, নজরুলের নর্তনশীল অসম-ছত্রের প্রবল তরঙ্গময় ছন্দ আর বিস্ফোরক শব্দাবলির যুগলবন্দি অনেক বেশি সৃজনশীলতার পরিচয় নিহিত হয়ে আছে। এ কথাগুলো যেন দিগন্ত ও আকাশকে ব্যাপ্ত করে বজ্রের মতো এখনও বাঙালির শ্রবণে ধ্বনিত হয়ে চলেছে:

আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,

আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।

আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,

আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহাহুঙ্কার,

আমি পিনাকপাণির ডমরু ত্রিশূল,ধর্মরাজের দ-,

আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচ-।

আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,

আমি দাবানল-দাহ, দহন করিব বিশ্ব।

আমি প্রাণখোলা হাসি-উল্লাস, আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,

আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস।

আমি কভু প্রশান্ত, কভু-অশান্ত, দারুণ স্বেচ্ছাচারী,

আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী।

আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,

আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্বল,

আমি উচ্ছল জল ছল ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!

এই যে হিন্দু ও ইসলামের পুরাণ, প্রকৃতির বিপুল ঘটনা-সবকিছু থেকে অগাধ বৈপরীত্যের সমাহার, এ তো শুধু তালিকা নয়, ছন্দেবন্ধে মিলে অনুপ্রাসে, প্রসঙ্গ ও ধ্বনির কঠিন-কোমল সজ্জায় এ এমন এক নির্মাণ, যার তুলনা বিরল। এর মূল কথা আর কিছুই না, কবি তার ‘আমিত্ব’-কে এমন বিশাল, উত্তুঙ্গ ও পরিব্যাপ্তভাবে অনুভব করেছেন যে, তা প্রায় বিশ্বের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছে। শুধু প্রকৃতিপরিবৃত মানব-বিশ্ব নয়, মানুষের সৃষ্ট শিল্প ও পুরাণের কল্পবিশ্বকেও তিনি গ্রহণ করেছেন, দেশ ও কালের সীমানা ভেঙে ইতিহাসে, ভূগোলে চলেছে তার ব্যাপক পরিক্রমা। কিন্তু বিশ্ব যেখানে এক হিসেবে আপাতভাবে এক নিষ্ক্রিয় অস্তিত্ব, সেখানে কবির আমি এক অতি সচেতন সত্তা, সে উচ্ছ্বাসে, উল্লাসে, উন্মাদনায়, উদ্ভাবনায় ভরপুর। সেই সুতীব্র জীবনের স্পন্দন এ কবিতায় নজরুল আশ্চর্যভাবে ধরে দিয়েছেন।

কিন্তু তার আমি যতই বড়ো হোক, তা বিরূপ সমালোচকদের কাছে যতই আস্ফালনের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাক, এ ‘আমি’ নিঃসঙ্গ নয়, স্বার্থপর নয়, কেবল নিজের মুদ্রাদোষে পৃথিবী ও মানবসমাজ থেকে আলাদা হয়ে থাকে না। নিজের স্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে প্রখরভাবে সচেতন হয়েও নজরুলের এই আমি অন্য মানুষের আমির সঙ্গে যুক্ত হয়, সেখানেই এই কবি মানবমুক্তির সংগ্রামের এক সেনাপতি হয়ে ওঠেন। তাই তার আমিত্বের উদঘোষণা শেষ হয় এই উচ্চারণে-

মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত,

আমি সেই দিন হব শান্ত,

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

আমি সেইদিন হব শান্ত।

আমাদের কৈশোর-যৌবনের ‘আমি’-কে মানুষের সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার কিছু সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছিলাম নজরুলের এসব কবিতা পড়েই।


৩.
জানি, বাংলার একাধিক ‘শিল্পবাদী’ সমালোচক এই নজরুলকে পছন্দ করেন না। বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ এই নজরুলকে অস্বীকার করতে চান, তাদের কাছে ‘অগ্নিবীণা’ ‘বিষের বাঁশী’, ‘ফণী-মনসা’, ‘সর্বহারা’ বা ‘সাম্যাবাদী’র নজরুলের চেয়ে ‘দোলনচাঁপা’, ‘চক্রবাক’ বা ‘সিন্ধু-হিন্দোল’-এর নজরুলকে বেশি বরণীয় মনে হয়। নজরুলের প্রেমের গান তাদের তার বিদ্রোহ ও প্রবল দেশপ্রেমের, পীড়িত মানুষের সাম্য ঘোষণার এবং সব মানুষের সমানাধিকার চাওয়া কবিতার চেয়ে বরণীয় মনে হয়েছে। আমাদের সাহিত্যের ক্লাসের অধ্যাপকরাও ওই একই কথা বলেছেন, যেন বিদ্রোহী নজরুল তাদের কাছে অন্ত্যজ, বর্জনীয়। আমি এই বিচারের অর্থ বুঝি না।

অবশ্যই নজরুলের কবিতার মতোই তার গানের মধ্যেও এক প্রবল নিজস্বতা আছে। উত্তরভারতীয় রাগরাগিণীর আশ্রয়ে রচিত (তিনি নিজেও বেশ কিছু রাগ সৃষ্টি করেছেন, তা আমরা জানি), কখনও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গীতের দূরাকর্ষণে জারিত, কখনও পল্লীগীতির মাধুর্যে স্নিগ্ধ তার প্রেম ও সৌন্দর্যের অজস্র গান এক ব্যাকুল রোমান্টিকতায় চিহ্নিত, তা বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রেমচেতনাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। কিছু দুর্লভ রাগরাগিণীতে আশ্রিত তার ঋতুসঙ্গীত আমাদের অনাস্বাদিত সৌন্দর্যের সন্ধান দেয়। কিন্তু মধ্যবিত্তের এই প্রেম ও সৌন্দর্যের এক্তিয়ারের বাইরে পড়ে আছে যে বিপুল মানববিশ্ব- যেখানে দারিদ্র্য, অসাম্য, পীড়ন, বঞ্চনা, অন্ধতা এখনও দূর করা সম্ভব হয়নি, সেখান থেকে নজরুলকে যে দাবি করা হবে, সাহস করে বলা হবে যে, নজরুল যে অনেক বেশি করে তাদের লোক, তা শিল্পবাদী সমালোচকরা অস্বীকার করবেন কী করে? শিল্পবাদী সমালোচকরা হয়তো তাদের সঙ্কীর্ণ ইতিহাসবোধ থেকে বলবেন, পরাধীনতা, অসাম্য, সাম্প্রদায়িক বিরোধ, দারিদ্র্য, বঞ্চনা-এসবই সাময়িক, ইতিহাসের কোনো একটা স্তরে আমাদের পীড়িত করে, কিন্তু নরনারীর প্রেম তো চিরন্তন। কাজেই প্রেমের কবিতা আর গানের মধ্যেই নজরুলের চিরকালীন স্থান।

এ কথাটা দু’দিক থেকে ভ্রান্ত বলে আমাদের মনে হয়। একটা ভ্রান্তি হলো এদের ইতিহাস-পাঠের অসম্পূর্ণতা। মানুষের এ সভ্যতার ইতিহাস তো কয়েক হাজার বৎসরের হলো, এখনও কি পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য, অসাম্য, বঞ্চনা, বিরোধ, নারীর অসম্মান সম্পূর্ণ দূর হয়ে গিয়ে স্বর্ণযুগের আবির্ভাব ঘটেছে? এই মধ্যবিত্ত শিল্পবিলাসীরা কি এমন কোনো তারিখ নির্দেশ করতে পারেন, ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না? তা তারা পারবেন না এ কথা তাদের স্বীকার করাই ভালো। তাই তাদের কোনো অধিকার নেই পীড়িত, বঞ্চিত, বিপন্ন মানুষের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবিকে সেই মানুষদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার, তাকে কেবল মধ্যবিত্তের কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ করার। তাই নজরুলের এ ছত্রগুলোর মূল্য শুধু বাংলাভাষী মানুষের কাছে নয়, শুধু উপমহাদেশের মানুষের কাছে নয়, পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে দীর্ঘদিন অমোঘ হয়ে থাকবে:
গাহি সাম্যের গান-

যেখানে আসিয়া এক হয়ে যায় সব বাধা-ব্যবধান।

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান।

গাহি সাম্যের গান।

কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?

দীর্ঘ তালিকার পরে তিনিই আমাদের অস্তিত্বের সারাৎসার কথাটি শুনিয়ে দেন-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

‘মানুষ’, ‘মানুষ’। এ মানুষ পুরুষ নয়, নারী নয়, মোল্লাপুরোহিত আর দরিদ্র ভক্ত নয়, বাবুসাব আর কুলি-মজুর নয়, শুধুই মানুষ। নজরুল সেই সমাজের স্বপ্ন দেখেন যে সমাজে কোনো অসাম্য থাকবে না, যাতে সব বঞ্চনা আর অত্যাচার বিলুপ্ত হবে। তা যথেষ্ট দ্রুত হচ্ছে না বলে তার আক্রোশ, মধ্যবিত্ত কাব্যবিলাসীদের থেকে এজন্যই প্রবল ক্রোধে নিজেকে পৃথক করে এনে তিনি বলেন-
প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস-

যেন লেখা হয় আমার রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ!

এমন অসহনীয় আন্তরিক আর্তনাদ পৃথিবীর খুব কম কবির মুখ থেকে বেরিয়েছে। শিল্পবাদীদের এ কবিকে খ-িত করে দেখার অপচেষ্টা সার্থক হবে না।

এরই সঙ্গে জড়িত শিল্পবাদীদের দ্বিতীয় ভ্রান্তি হলো, যে প্রেম চেতনার কথা তারা বলেন, তা নেহাতই মধ্যবিত্ত চেতনার স্তরের। তার মূল্য আমরা অস্বীকার করি না, আমরা মধ্যবিত্ত হিসেবে সেসব গানের বিপুল অভিজ্ঞতা আর সুরের বৈচিত্র্য বিস্মিত চিত্তে উপভোগ করে, কিন্তু উপমহাদেশের বৃহত্তর জনজীবনে অগ্রাধিকার কীসের? পরাধীনতার গ্লানি না হয় একভাবে চুকে গেছে, কিন্তু দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অসাম্য, বঞ্চনা তো তাদের রাক্ষস চেহারা নিয়ে এখনও ব্যাপকভাবে হাজির। এবং যারা এসবের শিকার তাদের এ সম্বন্ধে সম্যক চেতনাও নেই। কাজেই নজরুলের এসব কবিতা ও গান মানুষের পক্ষে যারা কাজ করবেন তাদের হাতের অস্ত্র হয়ে আরও অনেক অনেক দিন থাকবে, কারণ এসব কবিতা ও গান শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়- জীবন-পরিবর্তনের অস্ত্র, চেতনা উদ্বোধনের আলোকশিখা।

এ প্রসঙ্গে মনে আসে এক সময় প্রাগ-বাংলাদেশ পর্বে পাকিস্তানি শাসকদের নজরুলকে ইসলামের সঙ্গে একাত্মক করে দেখার চেষ্টা, রবীন্দ্রনাথের ‘প্রতিষেধক’ হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা, বদরুদ্দীন ওমর যাকে ‘নজরুল ইসলাম অহিফেন’ বলে বিদ্রƒপ করেছিলেন। এ চেষ্টা থেকে মৌলবাদীরা ক্ষান্ত হয়েছে তা নয়। কবে আমরা বুঝব যে, নজরুল সব মানুষের কবি, তিনি হিন্দুর নন, মুসলমানেরও নন, পৃথিবীর মানুষের কবি, মানব অস্তিত্বের যন্ত্রণা ও তার আর্তির কবি। এ কবিকে ধর্মীয় চিহ্ন দেয়ার অর্থ তাকে অপমান করা। তিনি তাকে নিয়ে মৌলবাদীদের এ বিকৃতবুদ্ধির ছিনিমিনিকে কী ভাষায় ধিক্কার দিতেন, তা শুধু কল্পনাই করতে পারি। 
*লেখাটি পুণ প্রকাশ

================
গদ্য কাকে বলে?
ড. মাহবুব হাসান

প্রশ্নটা নিজেকেই করলাম আমি জানি না গদ্য কাকে বলে আসলে আমি তো সরল বাংলায় কিছু কথা লিখি তা আমার ভাবনার অনুবাদ ভাবনাগুলো আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকলে আমি  সেই তাড়নার মগডালে উঠে বসি আর আমার ল্যাপটপ তখন আমাকে তার হৃদয়টা ব্যবহার করতে দেয় আমি আমার  মাতৃভাষায় যা ভাবি তাই লিখি একে গদ্য বলা যায় বলা যায় ভাবনারাজি বলা যায় কথামালা
বলা তো কতো কিছুই যায়, তা মানে জনা? আর মানতেই হবে এমন তো কোনো কথা নেই এই যে, যে ভাষায় আমার ভাবনাগুলোকে লিখছি, সেই  ভাবনাটা তো এই স্ট্যান্ডার্ড কলোক্যালে আসেনি এসেছে আমার আদি মায়ের ভাষায় সেই ভাষা আজ ইতরজনের ভাষা ইতর শব্দটি ভদ্রলোকেরা গালি  হিসেবে দেখেন কিন্তু সেই ভদ্র লোকেরা যখন ইতরতা করেন, তা কিন্তু ইতরজনের চেয়ে ঢের বেশি নিষ্ঠুর নৃশংস হয় সেটা আমরা বিচার-বিবেচনা
করি না কারণ তারা যে সমাজেরপতিস্বরুপ' মানুষ তারা যে ভাবে কথা বলেন, যেভাবে হাঁটেন, কাপড় পরেন, মাথা দোলান- আমরা তাকেই প্রগতিশীল বলে মনে করি, সেটাই ফলো করে নিজেকে যোগ্য করে তুলি তাদের কাছে সেটা করতে বাধ্য হই, আমাদের বাধ্য করা হয়েছে এমন এক সাংস্কৃতিক বাঁধনে, যা শাদা চোখে দেখা যায় না এটা শুরু করেছিলো ইংরেজরা সেই ঔপনিবেশিক ইংরেজি কৌশল এখন স্বাধীন দেশের শিক্ষিত-প্রাজ্ঞজনদের খেলার কৌশল
কারণ তারা উচ্চ শিক্ষিত, ডিগ্রিধারী মানুষ ইংরেজ-বাহিত শিক্ষায় তারা শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত আর গ্রাম-গঞ্জের অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর, যাকে আমরা বলি অশিক্ষিত, মানুষ পড়াশোনো করলেই সেই মানুষ শিক্ষিত, সুশিক্ষিত, আর না করলেই অশিক্ষিত, মূর্খ মানুষ শিক্ষা জিনিসটা অক্ষরজ্ঞানের সাথে যুক্ত বলে আমার  কখনোই মনে হয়নি কারণ আমি যখন হাঁটতে শিখেছি, তখন সেটাও শেখা সেটার জন্য অক্ষরজ্ঞানের দরকার হয়নি
সেই শেখাটা ছিলো অনিবার্য কারণ হাঁটতে না শিখলে হাঁটা, চলা-ফেরা, কাজকর্ম ইত্যাদি কিছুই করা হবে না, যাবে না  এই রকম, জনজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই আছে শিক্ষা সেই শিক্ষার ব্যাপারটা অবজ্ঞা করা হয় সব সময়অর্থাৎ জনজীবনের বড় একটা অংশকেই অবজ্ঞা করা হয়
আবার আমাদের সেই শিক্ষার কোনো মান নেই, মর্যাদা নেই, ডিগ্রিও নেই  ফলে নগরের শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত লোকদের কাছে তারা গেঁয়ো, তারা গ্রাম্য তারা মূর্খ
তারা চাষা, চাষাভুষো মানুষ ভালো একটা শব্দ মনে এলো চাষা কে চাষা? যিনি চাষ করেন কি চাষ করেন? ফসলাদি নিত্যদিন ইতর আর ভদ্র যারা পেটপুঁজোর জন্য যা খাই, তাই উৎপাদন করেন এই চাষারা এই চাষারাই সংখ্যায় বেশি এই চাষারাই ভদ্রজনদের গ্রাসের অন্ন উৎপাদন করেন নগরের আদুল শরীরের টাউট-বাটপার আর রাজনৈতিক  সামাজিক অর্থনৈতিক লুটেরাদের ভুড়ি বাড়ানোর সব শস্যকণাই ওই নিরক্ষর আর ইতরজনদের হাতে তৈরি বা সৃজিত এই ইতরশ্রেণির হাতে তৈরি খাদ্যশস্য  খেতে ঘেন্না লাগে না তেল-চকচকে নগরনট-নটীদের
যাহোক, এই চাষা শব্দটি নিয়েই কথা বলা যাক চাষ বা কর্ষণ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব না আসলে চাষ ছাড়া কিছুই করা যায় না যেমন সংস্কৃৃতি  শব্দটা সংস্কার থেকে এসেছে চাষ ব্যাপারটাও সংস্কার প্রতিনিয়ত যা সংস্কার করা হয়, তাই চাষ আরো একটা জিনিস প্রতিনিয়ত সংস্কার হয়, তা সংস্কৃতি
ইংরেজিতে কালচার শব্দটি কালটিভেশন থেকে এসেছে অর্থাৎ চাষাবাদ এই চাষাবাদের কাজটাকে আমাদের উচ্চশিক্ষিত সমাজের লোকেরা মোটামুটি ঘৃণার  চোখেই দেখেন কারণ তাদের শেখানোই হয়েছে চাষীরা অশিক্ষিত, গ্রাম্য, গায়ে-গতরে খেটে-খাওয়া মানুষ, ছা-পোষা ওদের কোনো কালচার বা সংস্কৃতি নেই
ওরা আনকালচার্ড -রকম করেই বলা হতো, বা  শেখানো হতো একসময় সেই ধারা এখনো অব্যাহত, তবে তার কায়দাটা ভিন্ন  শিক্ষার কারিকুলাম যারা  তৈরি করেন তারা ওই শ্রেণির মানুষ বা প্রতিনিধি তারা গণমানুষের শ্রেণি থেকে উঠে শিক্ষিত মানুষের শ্রেণিতে আসন পেয়েছেন তাদের তো দায়িত্ব আছে নব্য শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করার কারণ তিনি ভাবেন এরাই প্রাগ্রসর, এরা বৈতরণির হাল ধরে আছে, যে নৌকাটি স্বর্গে পৌছে যাবে একদিন
এখন অবশ্য অন্যভাবে বলে ধারাটা একই আছে, কেবল পাল্টে গেছে সেই বলার রীতি-পদ্ধতি, শব্দমালা, আয়োজনের চেহারা এমন কায়দায় তারা গ্রামের  লোকেদের নিয়ে আহামরি কথা বলেন যে মনে হবে এরাই আসল বন্ধু গরিব-গোবরোদের চাষাদের স্বার্থ নিয়েই তারা বক্তব্য ঝাড়বেন, যাতে প্রকৃত চাষারা  খেপে না উঠতে পারে যাতে তারা স্বপ্ন-সৌধ ভেঙে না দেয় নগরবাসীর
সাক্ষর না হলে সে শিক্ষিত নয়, বলা হচ্ছে কেন সাক্ষর না হলেই সে শিক্ষিত নয়? একজন চাষা তার ব্যক্তিগত  জীবনে যে অংকটুকু শিখেছিলেন এবং তার ব্যবহার করে উৎপাদনের সব রীতি-নীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করে আজ অবধি এসে পৌচেছেন, সেই ধারাবাহিকতার   নামই আমি বলি সংস্কৃতি এই সংস্কার অব্যাহত বলেই আমরা নগরসভ্যতার গোড়াটাকে পোক্ত করে গড়তে পারছি তাহলে অবদানটা কার? নগরের নটরাজদের?  নাকি নিরক্ষর প্রাণবীজদের?
শিক্ষিত নগরবাসির সংখ্যা নিরক্ষরদের চেয়ে ৮০ শতাংশই কম যতই বলা হোক না যে দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ সাক্ষর  যেন সাক্ষর হলেই কর্ম ফতে!  শিক্ষিত হয়ে গেলো, তো আর কোনো সমস্যা রইলো না আসলে পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা আমাদের মৌলিক চেতনা ভাবনার ঠিক বিপরীতে আমাদের প্রকৃত  ভাষা-সংস্কৃতির বিপক্ষে আমাদের থিংকিং প্রসেসের মধ্যে তাদের সাংস্কৃতিক উপাদান ঢুকিয়ে দিয়ে আমাদের মৌলিকত্বকে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে
যেমন আমাদের ধানের জাত শত শত ধরনের ধানবীজ ছিলো আমাদের, আজ তার কয়টাকে খুঁজে পাওয়া যায়? ভাষাকেও ঠিক একই  কায়দায় গ্রাস করেছিলো হিন্দত্ববাদি সংস্কৃত পন্ডিতরা তারা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ প্রণয়ন করতে গিয়ে সংস্কৃত ব্যাবরণের স্ট্যাকচারকেই ব্যবহার করেছেন সেই সাথে ঢুকিয়ে দিয়েছেন অনেক সংস্কৃতজাত শব্দ
 ফলে আমরা বহুকাল ধরে জানতাম যে বাংলার হচ্ছে সংস্কৃতের দুহিতা অর্থাৎ সংস্কৃতের গর্ভজাত হচ্ছে বাংলা আসলে সঙস্কৃতের সাথে এর কোনো  যোগাযোগই নেই কেবল সংস্কৃত পন্ডিতদের অপকর্মটি না হলে, আমাদের ভাষাস্বাধীঢন থাকতো মরে যাওয়ার পরও সংস্কৃত আমাদের ভাষিক সাম্রাজ্যটিকে  দখলে রেখেছে
এখনো বেশির-ভাগ মানুষ জানে বাংলা ভাষার মা হচ্ছে সংস্কৃত এই মিথ্যাটা দূর করতে পারিনি আমরা আমরা ভাবি, যা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তাই ভালো আবার একে কেন নতুন করে গড়তে হবে? সে যে অনেক ঝক্কির কাজ  কে সেই কাজ করবেন?
নগরের লোকেরা কিভাবে বদমাইশিটা করে, সেটা জানা থাকা ভালো যা কিছু লেখাজোখা হবে, তা প্রমিত বাংলায় করতে হবে আমরা মাথা পেতে নিয়েছি কারণ আমরাই তো লেখালোখিটা করি আমরাই তো পড়ি নিরক্ষর তো আর পড়তে পারে না আমাদের লেখা আমাদের লোকেরাই আবার বাহবা দেয় সেটাই
স্বাভাবিক গায়ের লোকেরা তো আর আমাদের লেখা পড়ে না তারা তো আমাদের লেখার ভাষা শেখেনি তারা লাঙল চালাতে শিখেছে কলম চালনার চেয়েও শতগুণ ভালো ভাবে কিন্তু আমরা কলম চালনাটাও ভালো ভাবে শিখতে পারিনি নিজেদের ভাষা নিজেরাই ভালো করে শিখিনি তারপরও আমরাই পন্ডিত,  আমরাই সেরা নিজেদের পিঠ নিজেরাই চাপড়াই পরস্পরের পিঠচুলকানিতে আমাদের মতো সেরা -দুনিয়ায় কেউ নেই
আমরাই পুরস্কারের দাবিদার আমরাই বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার পাই আমরাই কামড়াকামড়ি করি সেই পুরস্কারের জন্য একজনের বিরুদ্ধে গিয়ে আরেকজনকে হাত করি তারপর একুশের পদকের জন্য লাইন দেই রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তারা আমাদের সেই পদক পাইয়ে দেন
আমরা একুশের পদক পাই নিজেদের গৌরবের মণি কোঠায় উঠে যাই এমন কি আমাদের ভাবনা নোবল প্রাইজ পর্যন্ত ছুঁয়ে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,  . অমত্য সেন আর . মুহাম্মদ ইউনূস যদি পেতে পারেন, তাহলে আমি কেন পাবো না ? ঠিক, একদিন না একদিন ঠিকই নোবল পাইজ পেয়ে যাবো আমি/আমরা
কিন্তু যে উৎপাদিকা শক্তির কথা বলেছি তারা জানতেও পারবে না তাদেরই সন্তান নোবল পেয়েছে তাদের ভাষায় কিছু না লিখেই নিজের ভাষায়ও  যদি লিখে থাকেন তারপরও সেই ভাষাটা গরিষ্ঠ মানুষের কাছে ভিনদেশি ভাষা,সান্ধ্যভাষা কারণ ওই ভাষা সে জানে না, কম্যুনিকেট করতে পারে না  তাদের ভাবনারাজ্য লোকাল শব্দে ভরপুর
তাদের সেই লোকাল বা আঞ্চলিক ভাষায় তো আমরা লিখি না সেই শব্দ তো আমরা জানি না আমার কাছে স্প্যানিশ বা ফ্রেন্স যেমন দুর্বোধ্য, তেমনি  বাঙালি চাষার কাছেও আমাদের নগরের স্ট্যান্ডার্ড কলোক্যাল দুর্বোধ্য যাকে আমরা প্রমিত বলে দাবি করছি
ভাবনার নিজস্ব শব্দ আছে, সেই ভাষায় আমরা কিছুই লিখতে পারি না আর আমাদের চিন্তার ব্যাকরণ নেই নেই সেখানে কোনো সমাজপতির নিয়ন্ত্রণ  অগ্রগণ্য মনীষীদের চিন্তার ধারাপাতও আমি নিতে রাজি নই নিজে যা ভাবি, আমার সেই সব ভাবনারাজি অনুবাদ করি স্ট্যান্ডার্ড কলোক্যালে
.
আমাদের চিন্তাশীল মননশীল লেখকরা রবীন্দ্র-নজরুল ছাড়া কোনো কথা বলেন না মানে ওই দুজন হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীতার পানপাত্র  রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে কিছু লিখলেই তা গণ্য তারা রবীন্দ্রনাথের কৃতিকে নিজেদের পোশাক বানিয়ে নিয়েছেন কারণ তাদের নিজস্ব কোনো পোশাক নেই
ইংরেজি সাহিত্য পাঠ করেছেন এমন কিছু লোক, সেকসপীয়র থেকে শুরু করে হেমিংওয়ে, জেমস জয়েস ইত্যাদি নিয়ে আলোচনায় মগ্ন জে.জে ঢাউস  ইউলিসিস নিয়ে এখনো তর্কের তামাশা চলছে জে.জে পরও যে কতো ভিন্ন ভিন্ন ইউলিসিস লেখা হয়ে গেছে, কিংবা অন্যরকম সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, সেই  সব বোদ্ধাদের মগজে তা ঢোকেইনি, জানিও না আমরা সেই খবর নেবার রাখার সময় তাদের কোথায়?
একুশ শতকের এই ঘোর-লাগা সময়ে নতুন সব ভাবনা আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে মহাসাগরের অতলে সেখানেই ডুব দেয়া জরুরি

=====
আবুল ফজল: জন্মের ১১১ বছর পর
. মাহফুজ পারভেজ

মৃত্যুর কিছু বছর পর, সামাজিক তো বটেই, পারিবারিক অঙ্গনেও অনেকই বিস্মৃত হন নিদেন পক্ষে কেউ কেউ থেকে যান মোহাফেজখানার প্রায়োন্ধকার প্রকোষ্ঠে কিংবা বিশেষায়িত গবেষণার পাদটীকায় এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিতর্পণে কিন্তু আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের মনীষাম-লীর অন্যতম, যার প্রভাব একবিংশেও সামাজিক জীবনে প্রবহমান; ভাব চিন্তার তরঙ্গে আন্দোলিত  লিখিত ভাষ্যে তাঁর জন্মদিন চলে গেছে জুলাই; আর পিতার ডায়েরিতে লেখা তারিখ গণ্য করা হলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় ১৭ জুলাই চলতি ২০১৪ সালে তাঁর জন্মের ১১১ বছর আর মৃত্যুর ৩১ বছর পূর্তির সাল এই সময়-সন্ধিক্ষণে চিহ্ণিত করা জরুরি যে, আবুল ফজলকে নিয়ে আলোচনা মূল্যায়ন দুইটি বিপরীতধর্মী এক্সস্টিমে পরিচালিত হয়েছে যারা আহমদ ছফারবাঙালী মুসলমানের মনপড়েছেন, তারা তাঁকে যেভাবে দেখবেন, অন্যদের লেখায় (শতবার্ষকী স্মারকগ্রন্থভুক্তগণ) তাঁকে দেখা যাবে বিপ্রতীকে খণ্ড-খণ্ড অবলোকনের সংগ্রন্থনে সামগ্রিক চরিত্র-চিত্রণ এবং ব্যক্তিত্ব কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বহুমাত্রিক আবুল ফজলের উদ্ভাসনের লক্ষে সমীক্ষা পরিচালনা করাই শতবর্ষ-পরবর্তী প্রেক্ষাপটের অপরিহার্য দাবি ফলে যারা এখনই তাঁকে ঘিরে একটি উপসংহারে উপনীত হতে চান, তাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত মতের সাযুজ্য হওয়ার কোনওই কারণ নেই কিংবা যারা তাঁর চারপাশে কারার প্রাচীরের মতো যতি চিহ্ণ লেপন করে তাঁর সম্পর্কে শেষ কথা বলে দিতে প্রস্তুত, তাদের উদ্যোগও আমার কাছে সন্দেহজনক আবুল ফজলচর্চার ক্ষেত্রে যারা অতিদ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিশ্লেষণের তড়িৎ পরিসমাপ্তি ঘটাতে ইচ্ছুক, তারা সাহসের দিক থেকে কাণ্ডজ্ঞানহীন হলেও জ্ঞানের দিক থেকে অগভীর চঞ্চল-চপল মতি   
আবুল ফজল ১০ বছর বয়সে (১৯১৩) মুসলিম নিু-মধ্যবিত্ত পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গ্রাম থেকে পিতার হাত ধরে চট্টগ্রাম শহরে এসে আন্দরকিল্লা মসজিদে এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় উঠেছিলেন পরবর্তী ৭০ বছরের জীবন তিনি শহরের পার্শ্ববর্তী কাজীর দেউড়িরসাহিত্য নিকেতন’- কাটিয়ে সেখানেই মারা যান আন্দরকিল্লা থেকে কাজীর দেউড়ির দূরত্ব এক-দেড় মাইলের বেশি না হলেও তিনি তত দিনে অতিক্রম করেছিলেন যোজন যোজন মানসিক পথ ধর্মশিক্ষক পিতার বৃত্তি মনোদার্শনিক-সাংস্কৃতিক গণ্ডিও তিনি পেরিয়ে আসেন তাঁর এই পথ পরিক্রমণকে কেউ কেউ বাঙালি মুসলমানেরসেক্যুলারঅভিযাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন কিন্তু আবুল ফজলের সেক্যুলারিজম ধর্মহীনতার পথে যায় নি আজকের যে কোনও শিক্ষিত মানুষ যা করতেন, তিনি শতবর্ষ আগেই সেটা করেছেনÑ ধর্ম আধুনিক জীবনের সমন্বয় বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের আধুনিকতার প্রথম পুরুষদের অন্যতম তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলররূপে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা বিকাশের নেতৃত্বের পাশাপাশি, কথাও মনে রাখতে হবে যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পরিকল্পক নির্মাণ উদ্যোক্তাও তিনি ফলে আবুল ফজলকে সেক্যুলার ক্যাম্পে ঠেলে দেওয়া হলে কারও কারও বিশেষ লাভ হলেও হতে পারে, তাঁর ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না এতে একটি ব্যাপক অংশের মানুষের কাছ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হবে আবার কথাও মনে রাখতে হবে যে, বিংশ শতকের জন্য প্রাসঙ্গিক অর্থডক্স চিন্তা জগতের বাসিন্দাও তিনি ছিলেন না আবুল ফজল নিজেও দ্বিধা-বিভক্ত বিশ্বাসজাত মননের কোনওই চিহ্ণ কখনওই আঁকেন নি তাঁর সমগ্র রচনাবলিতে ধর্মের প্রতি আক্রমণ বা অসহিষ্ণুতার লেশ মাত্র নেই; প্রগতির নামে উল্লম্ফনও নেই  তাঁর মধ্যে আছে জ্ঞানস্পৃহা, মানবপ্রেম, আধুনিক জিজ্ঞাসা এবং নান্দনিক তৃষ্ণা আবুল ফজলের প্রথম সৃষ্টিচৌচিরউপন্যাসের নায়ক তসলিম চট্টগ্রামের রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ করে বড় হয়েও ইতালির জাদুঘরে ঢুকে এখানকার অতীত বর্তমান চিত্রকলা দেখে ভাবেন:
‘‘মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ভাবধারা প্রকাশের এমন উত্তম বাহন যে চিত্রশিল্প, তা কী মানুষের ধর্ম ইসলাম হারাম করিতে পারে? ... আমাদের ইসলামকে বুঝিবার বুঝাইবার ভুল ... এটা হারাম, ওটা না-জায়েজ, এই করিয়া বিশ্বের এই জ্ঞানের অভিযানে আধুনিক মুসলমান তাহার হক আদায় করিতেছে না; এই জন্য একদিন তাহাকে পস্তাইতে হইবে’’ 
আবুল ফজলেরজীবন পথের যাত্রীগ্রন্থেও ইসলামী আদর্শের পটভূমিকায় মুসলমানদের সংস্কার-মুক্তির প্রয়াস ব্যাপকতর প্রেক্ষিতে চিত্রিত হয়েছে প্রয়াস দস্তুরমতো সংগ্রামমুখর পুরাতনের সঙ্গে নতুনের সংগ্রাম, আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষায় উদ্বুদ্ধ আধুনিক মনের সঙ্গে প্রাচীন অচলায়তনের দ্বন্দ্বে তিনি উগ্র বিপ্লবীর ভূমিকা না নিয়ে যুক্তির পথ বেছে নিয়েছেন সোসিয়ালিজমের প্রতি ঝুঁকে পড়া হেনা-প্রণয়ী মামুন একদিন অদূরবর্তী মসজিদের প্রভাতী-আজান শুনে আদর্শ হিসাবে সোসিয়ালিজমের ব্যর্থতায় স্থির নিশ্চিত হয়ে সঙ্কল্প করলেন, ‘বৃহত্তর পরিধিতে জীবনের বৃহত্তর বিকাশ নাই বা হলো ক্ষুদ্রাকারে ক্ষুদ্রতর জীবন সে গড়ে তুলবে, পিতামাতাকে সে খুশি করবে, ভাই-বোনগুলিকে সে মানুষ করবে সঙ্কল্প তিনি অচিরেই কার্যে পরিণত করেন হেনার ভাই মুহসিন চিন্তাজগতে মুসলমানদের আদর্শ তারাশ করেন যুগদ্রষ্ট্রা কবি ইকবালেরমুসলিম হ্যাঁ হাম, ওয়াতন হ্যেয় সারা জাহাঁ হামারানামক উক্তিতে এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সে বলে: ‘ শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, এই বাণী প্রতিটি মানুষের জন্যেই সত্য দেশ, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদিও সীমারেখা এখন মুছে গেছে, মুছে যেতে বাধ্য এখন প্রত্যেক সচেতন মানুষই চিন্তা আদর্শে আন্তর্জাতিকতাই তার মতে: ‘ শুধু নিজের ভালো করার চেয়ে দশের ভালো করার চেষ্টা কি মহত্তম কাজ নয়? বিশেষত, পৃথিবীর নিজের স্বতন্ত্র বিচ্ছিন্ন ভালো বলে যখন কিছুই নেই আমরা দশজনের একজন, দেশের ভালোমন্দের সঙ্গে আমাদের ভালোমন্দও জড়িতহেনা যখন এসবকে কমিউনিজম বলে সন্দেহ করে, তখন মুহসীন মুসলমানের তথা ইসলামের আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী বলেই জোরে বলতে পারে, আরবের মহাপুরুষের পর গত চৌদ্দ শত বৎসরের মধ্যে এমন অগ্নিগর্ভ নব-আদর্শ মানবসমাজে আর কেউ প্রচার করেন নি আসলে সে ক্ষুদ্র আদর্শ কমিউনিজম চায় না, চায় আন্তর্জাতিক পটভূমিকায় ইসলাম-এর বৃহত্তর আদর্শ এটি তার ইসলাম-বিমুখতা নয় বরং ইসলামী আদর্শবাদিতার প্রতি গভীর প্রীতি, শ্রদ্ধা মমত্ববোধ
একইভাবে আবুল ফজলের শেষ দিকের উপন্যাসরাঙা প্রভাত’- দেখা যায়, ইসলাম স্বদেশপ্রেমের মধ্যস্থতায় মানব প্রেমরূপে তাঁর ধ্যানে ধরা দিয়েছে নায়ক কামাল মির্জা অভিজাত ঘরের ছেলে হয়েও যখন ধর্মের প্রতি তার যে রকম আকর্ষণ, অর্থাৎ মির্জাবংশের ভাবী উত্তরাধিকারীর যে রকম থাকা উচিত সে রকম দেখা গেল না, তখন তার অভিভাবক-স্থানীয়, মৃত্যু-পথযাত্রী দাদু রোগ-শয্যায় শুয়ে তাকে মির্জা বংশের ইসলামী ঐতিহ্য রক্ষা করার জন্য এই বলে ওসিয়ত করলেন যে, ‘নামাজ-রোজায় মন রাখবে, গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করবে, বিদ্বান আলেমদের কদও করবে, কোনও মোসাফেরকে অভুক্ত বাড়ি থেকে ফিরে যেতে দেবে না... মুসলমানদের মতো আমাদের বহু হিন্দু প্রজা হিন্দু প্রতিবেশী রয়েছে, তাদের প্রতি সুব্যবহার করবে, কোনও দিন কোনও বৈষম্য করবে না ইনসাফ বড় কথা সবার সঙ্গে ইনসাফ মতো ব্যবহার করবে ... যে যাই বলুক, আমাদের হজরতের চেয়ে বড় কেউ এখনও জন্মায় নি তিনি বলেছেন, ‘হুববুল ওতনে মিনাল ঈমান’Ñস্বদেশপ্রেম ঈমানের অন্তর্গত যে নিজের দেশকে ভালোবাসে না, তার ঈমান কথনও কামেল হতে পারে না ওসিয়তের  পরেই কামাল দাদা-দাদি দুজনকেই একসাথে হারিয়ে বহু কষ্টে বড় হলো বটে, তবে মির্জা-পরিবারের ইসলামী ঐতিহ্যের সবটুকু সে রক্ষা করতে পারল কি না; জানিনে একটা ঐতিহ্য সে বহন করে চলল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই সে হচ্ছে তার স্বদেশপ্রেম দেশ বিভক্ত হয়ে যখন স্বাধীন হলো, দেশের প্রতি তার প্রেম গেল বেড়ে, আর প্রতিবেশী হিন্দুর প্রতি শুধু ইনসাফ নয়, তার চেয়েও বেশি করে বেড়ে চলল তার আন্তরিক উদারতা সে প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল, ‘স্বদেশের মানুষকে বাদ দিয়ে শুধু নয়, রীতিমতো ঘৃণা করেই, দেশপ্রেমের বুলি আওড়ানো একমাত্র আমাদের দেশেই চলে... দেশ স্বাধীন হয়েছে, ভাগও হয়েছে, দু'দিকে বাস্তুহারার ভিড় রেগেছে, সবকেও সহজভাবে নিতে হবেকামালের ভাবী জীবনসঙ্গিনী মায়ারও সেই কথা দু'জনে এসবকে সহজভাবে গ্রহণ করে বহু দুঃখ-বেদনা ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করেও দেশকে ভালোবাসল, ভালোবাসল দেশের মানুষকে এভাবেই ইসলাম এসে দাঁড়াল দেশপ্রেমে, দেশপ্রেম দাঁড়াল দেশের নর-নারীর প্রতি প্রেমে, আর দেশের নর-নারীর প্রতি যে প্রেম তা এস দাঁড়াল মানবের প্রতি প্রেম ভালোবাসায়, প্রীতিতে এখানে তারা ঘোষণা করেজীবনে তাদের মন্ত্র হবে মানবপ্রেমআবুল ফজলের মানবতন্ত্রী প্রতিরূপ আরও স্পষ্ট হয়, উপন্যাসের উপান্তে নায়ক-নায়িকার মনোবাঞ্ছায়: ‘আজকের এই রাঙা প্রভাত যেন দেশের তাদের নিজের জীবনে এক নতুন যুগের নতুন জীবনের রাঙা প্রভাতের সূচনা করে’      
জন্মের শতবর্ষ পরের বাংলাদেশেও আবুল ফজলের চিন্তা-আকাক্সক্ষা প্লেটোরআদর্শ রাষ্ট্রে মতোই কাল্পনিক অধরা রয়ে যায় রাঙা প্রভাতের অরুণালোকে সুমুজ্জ্বল দেশ মানুষ এখন সুদূরপরাহত ধর্ম দর্শনের নানা কুসংস্কারে আবৃত জাত-পাতের বদলে চিন্তাগোত্রে বিভক্ত অথচ ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা মনুষ্যত্ব সম্পর্কে আবুল ফজল বেশ ঋজুতায় তার বক্তব্য দিয়েছেন তাঁর মতে, ‘ধর্ম যদি মনুষ্যত্বের পরিপূরক বা নামান্তর না হয় তাহলে ধর্মে আর মনুষ্যত্বে পদে পদে সংঘাত অনিবার্যতিনি মনে করেন, ‘ধার্মিক না হয়েও ধর্মের নামে গদগদ হওয়া আর মনে সেক্যুলার না হয়েও সেক্যুলারিজমের নামে মুক্তকচ্ছ তেমন কোনও বিরল দৃশ্য নয় আজকের দিনে যদিও সেক্যুলারিজমের অর্থ করা হয়ধর্মনিরপেক্ষতা’Ñআসলে ওটাও একটা পোষাকি ধর্মসাম্প্রদায়িকতার আর একটি নতুন নাম - এক রকমমিটিংকা কাপড়াতাঁর বক্তব্য, ‘যা অপার্থিব তাকে অপার্থিব থাকতে দিনযা পার্থিব তাকে সর্বতোভাবে পার্থিবের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখুন অপার্থিবের তথা আধ্যাত্মিকের প্রেরণা তৃষ্ণা মানুষ যে একেবারে অনুবব করে না বা তার কোনও প্রয়োজন নেই তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয় আমি বলতে চাচ্ছি, তা ব্যক্তিগত সাধনা উপলব্ধির ব্যাপার তাকে সামাজিক রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে টেনে আনায় আমার আপত্তি, টেনে আনলে শুধু সামাজিক জীবন নয়, আধ্যাত্মিক জীবনও নাজেহাল হয়’  
ভাবতে অবাক হতে হয়, সামান্য স্কুল শিক্ষক হিসাবে আবুল ফজল জীবন শুরু করেন এবং পরে সরকারি কলেজে বাংলার অধ্যাপক নিযুক্ত হন তাঁর অধ্যাপনা জীবনের সূচনা হয়েছিল কৃষ্ণনগর কলেজেÑকিন্তু কিছুকাল পরেই বদলি হয়ে আসেন চট্টগ্রামে এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকেই ১৯৫৯ সালে অবসর নেন স্বদেশে প্রেরিত-পুরুষেরও প্রাপ্য মর্যাদা মেলে নাÑএই আপ্তবাক্য আবুল ফজলের বেলায় প্রযোজ্য হয় নি বিত্তহীন, ক্ষমতাহীন, জলুসহীন নিরহঙ্কার শিক্ষক নিজ শহর চট্টগ্রামে সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছ থেকে ঈর্ষণীয় শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন দেশের প্রত্যন্তের বাণিজ্যতাড়িত নগরীর চিন্তালয় ছিলেন তিনি তাঁর সকল চিন্তা স্বদেশ, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শকের অসীমান্তিক জগতকে স্পর্শ করেছে এখানেই আবুল ফজলকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ পর্যবেক্ষণের কারণ তিনি এবং তাঁর সমকালীন কিছু মনীষা চট্টগ্রামে শেকড় বিছিয়েও মহাদ্রুমের মতো সমগ্র দেশের দিগন্তে প্রসারিত হয়েছেন সে দেশ উপনিবেশিক বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ, যা- হোক না কেন এদের মধ্যে রয়েছেন . মুহাম্মদ এনামুল হক, . আবদুল করিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বলতে দ্বিধা নেই, বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের পর এইসব ঋপদী ব্যক্তিত্বের মানুষ ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছেনÑযারা স্থানীক, আঞ্চলিক, কালিক অবস্থান ভেদে সার্বজনীন আবয়বে জাতীয় স্তরে দাঁড়ানোর শক্তি রাখেন আবুল ফজলের প্রাসঙ্গিকতার আরেকটি দিক হলো, স্বাতন্ত্রিকতা তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি বা বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের সময় কাজ করলেও  নিজের সত্ত্বা স্বাতন্ত্রিকতা বিসর্জন দেন নি অনেকের শিক্ষা-পাণ্ডিত্য-মনীষা আবুল ফজলের চেয়ে উচ্চতর হলেও সামরিক বা বেসামরিক সরকারের স্তবকতায় নানাভাবে নিন্দিত কিন্তু ব্যক্তিত্বের ঋজুতায় আবুল ফজল অনন্য ব্যক্তিগত জীবনে অমায়িক, স্বল্পভাষী, হাস্যোজ্জ্বল সৌমদর্শন বৃদ্ধ যে কোনও অসঙ্গতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভয়শূন্য সেনাপতির বিক্রমে ক্রমাগত রুখে দাঁড়িয়েছেন ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বি পরীক্ষার পাসের হার ছিল অত্যন্ত শোচনীয় ফলাফল প্রকাশের অব্যবহিতকাল পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান জনসভায় শিক্ষকদের সম্পর্কে একটি দুঃখজনক মন্তব্য করেন তৎকালীন উপাচার্য আবুল ফজল এর প্রত্যুত্তরে অনতিবিলম্বে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকৃত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে যে বক্তব্য দেন তাতে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীনরা চটে যায় তাঁকে নাজেহালের নানা পন্থা অবলম্বন করা হয় সকল কুৎসার মুখেও নিজ বিশ্বাসে তিনি ছিলেন অটল একটি শব্দও তিনি তাঁর বক্তব্য থেকে প্রত্যাহার করেন নি একই বছর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়  ছাত্র সংসদের নির্বাচন ঘোষণা করলে দেখা গেলো সরকার-বিরোধী ছাত্র সংগঠন বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতার শীর্ষ থেকে অবিরাম চাপ দিয়েও তাঁকে দিয়ে নির্বাচন বন্ধ করানো যায় নি নিজস্ব শুভবুদ্ধি বিবেকের স্বাধীনতার প্রতিই তিনি ছিলেন একান্তভাবে দায়বদ্ধ
ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় শক্তি সম্পর্কেলেখকের স্বাধীনতাপ্রবন্ধে আবুল ফজল যথার্থই বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রশক্তির একটি সাধারণ দুর্বলতা সন্দেহপ্রবণতা, বিশেষ করে মননশীল মানুষকে, সাধারণ অর্থে যাদেও বুদ্ধিজীবী বলা হয়, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা ক্ষমতার একটি স্বভাব ক্ষমতার যেন এক সহজাত প্রবণতা ক্ষমতার আর একটি দুর্বলতা সুযোগ পেলেই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া দেখা গেছে, অতি বড় সজ্জনও যখন ক্ষমতার আসনে বসেন তখন মুহূর্তে তিনি হারিয়ে ফেলেন সব রকম পরিমিতিবোধ, তখন সীমা লঙ্ঘন হয়ে দাঁড়ায় তাঁর স্বভাব কারণে জ্ঞানীরা সব সময় ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন এবং কেউ কেউ ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করেছেন - দেখা যায়, ক্ষমতা সব সময় ছাপার অক্ষরকেও যেন কিছুটা ভয় করে থাকে ক্ষমতার মনোভাব প্রায়শ সরাসরিভাবে লেখকদের আঘাত হেনে থাকে
সিভিলি সোসাইটির পক্ষে পলিটিক্যার সোসাইটির বিরুদ্ধে; ব্যক্তি-শিল্পী-লেখক-সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে এতো জোরালোভাবে বলতে খুব কমই শোনা যায়, যেমন ঋজুতায়-দৃঢ়তায় বলেন আবুল ফজল প্রান্তিক, অন্তজ্য, সাবঅল্টান, লৈঙ্গিক অনেক দূরবর্তী অনুসঙ্গ তাঁর কলমে মূর্ত হলেও আবুল ফজলের প্রধান কণ্ঠস্বর সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম রাষ্ট্রের মূলস্রোতের সাপেক্ষে উচ্চারিত তিনি যা বলতে চেয়েছেন, এক দশ বছর পরেও সেটা ধর্মপন্থীরাও বুঝে নি; সেক্যুরাররাও নয় কারণেই হেফাজত শাহবাগ যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তখনই আবুল ফজলের কথা মনে পড়ে, যার কাছে বহুমত পথের মানুষ এসে স্বাচ্ছন্দ্যে মিলিত হতে পারে আবুল ফজলচর্চার সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ভবিষ্যৎ তাৎপর্য এখানেই নিহিত           

==================================
আত্মা নয়; মানব দেহের গুরত্বপূর্ণ কেন্দ্র নাভি!
জিনাত জাহান খান


"... মানব দেহের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ কেন্দ্র হল নাভি,  তারপর বিকাশ হয় হৃদয়ের এবং তারপর মনের। এই সব শাখার বিকাশ হয় পরে, যেমন উদ্ভিদের সব শেষ বিকাশ ফুল। জ্ঞানের ফুল ফোটে মনে আর প্রেমের ফুল ফোটে হৃদয়ে। আর এই গুলি হল সেই ফুল যা আমাদের প্রলুব্ধ করে এবং ভাবতে শুরু করি জীবনে এই হল সার। কিন্তু মানব দেহের মূল এবং জীবনী-শক্তি হল তার নাভিতে। যেখানে কোন ফুল ফোটে না। মূল অদৃশ্যমান, তাদের কখনও দেখা যায় না। কিন্তু গত পাঁচ হাজার বছর ধরে মানুষের এই অধোগতির কারণ হয় তারা মনের উপর সকল গুরত্ব আরোপ করেছে অথবা হৃদয়ের উপর। এমন কি হৃদয়ের উপরও আমরা তুলনামূলক কম গুরত্ব আরোপ করেছি, অধিকাংশ গুরত্ব পেয়েছে আমাদের মন।
খুব শৈশব থেকে আমাদের সকল শিক্ষা ব্যবস্থাই আমাদের মনের শিক্ষা। পৃথিবীর কোথাও এই নাভিমূলের শিক্ষা ব্যাবস্থা নেই। সকল শিক্ষা ব্যবস্থা মনের সূতরাং মন ক্রমশ বেড়ে চলেছে এবং দেহমূল ক্রমশ ছোট হয়েছে। আমরা মনের যত্ন নেই কারণ এখানেই ফুল ফোটে, সূতরাং এটির বৃদ্ধি হয়েছেআর আমাদের মূল তিরোহিত হয়েছে। তারপর জীবনী-শক্তির প্রবাহ ক্রমশ ক্ষীণ হয়েছে এবং আত্মার সাথে আমাদের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ধীরে ধীরে আজ আমরা এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছি যখন মানুষ বলছে, “আত্মা কোথায়? কে বলে যে আত্মা আছে? আমরা তো কোন কিছুই খুঁজে পাই না।আমরাও খুঁজে কিছু পাবো না। কেউ খুঁজে কিছুই বের করতে পারবেন না। কেউ যদি বৃক্ষের সারা দেহ খুঁজে বলেন, “ মূল কোথায়? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।” –এ ক্ষেত্রে তিনি যা বলছেন তাতো ঠিকই। গাছের উপরের অংশে কোথাও কোন মূল নেই। এবং মূল যেখানে আছে সেখানে প্রবেশ করছি না আমরা; সে স্থান সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। খুব ছোটবেলা থেকেই আমাদের সকল শিক্ষা-দীক্ষা মনের, সূতরাং আমাদের সকল মনসংযোগ মনের উপরেই নিবদ্ধ। তারপর আমাদের সারা জীবন কাটে এই মনকে ঘিরেই। আমাদের সচেতনতা এর নিচে নামতেই পারে না।
একজন যোগীর যাত্রা নিম্নগামী, মূল অভিমুখে। তাঁকে মাথা থেকে হৃদয়ে এবং হৃদয় থেকে নাভিমূলে অবরোহন করতেই হয়। কারো পক্ষে শুধুমাত্র নাভিমূলের মাধ্যমেই আত্মায় প্রবেশ করা সম্ভব তাছাড়া অন্য কোন ভাবে সম্ভব নয়।
সাধারণ ভাবে আমরা নাভি থেকে মাথার দিকে গতিশীল থাকি। একজন সাধকের গতি ঠিক তার উলটো দিকেঃ তাঁকে মাথা থেকে নাভিতে নেমে আসতেই হবে।
ধীরে ধীরে আমি আপনাদের বলব এবং করে দেখাব কিভাবে একে একে মাথা থেকে হৃদয়ে এবং হৃদয় থেকে নাভিমূলে নেমে আসতে হয়এবং কি ভাবে নাভি থেকে আত্মায় প্রবেশ করতে হয়।
আজ দেহ সম্পর্কে কিছু বিষয় বলা খুবই প্রয়োজন।
প্রথমত বোঝা দরকার যে, মানব দেহের জীবনী-শক্তির কেন্দ্র নাভিমূল। কেবল সেখান থেকেই শিশু জীবন পায়; কেবল সেখান থেকেই তার দেহের অন্যান্য শাখা প্রশাখা বিস্তার লাভ করতে শুরু করে; কেবল সেখান থেকেই সে শক্তি পায়; কেবল সেখান থেকেই সে প্রাণ ধারণ করে। কিন্তু এই কেন্দ্রটির প্রতি কখনই আমাদের মনযোগ দেয়া হয় না এক মিনিটের জন্যও না। ওটা যে আমাদের শক্তি কেন্দ্র, প্রাণ কেন্দ্র সে হিসেবে কখন ভাবাই হয় না। উপরন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত পদ্ধতি এমন যে তা এ বিষয়টিকে ভুলে যেতেই সাহায্য করেছে। আর সে কারণেই আমাদের সকল শিক্ষা ব্যবস্থার এহেন দূরাবস্থা।..."

============
নিন্দিত গোয়েবলস্: বিশ্বজুড়ে এক নিন্দিত নাম
মাহবুবুল হক শাকিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার এতো বছর পরেও নাৎসী জার্মানীর ফুয়েরার হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস এখনও বিশ্বজুড়ে এক নিন্দিত নাম, অপপ্রচার আর প্র্রপাগান্ডার প্রতিশব্দ
নেতার প্রতি অগাধ আনুগত্য, আত্মবিশ্বাস, শব্দ বাগ্মীতার গাঁথুনি আর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ-কৌশল দিয়ে গোয়েবলস শুধু নাৎসী পার্টি, জার্মান সেনাবাহিনী সাধারণ জার্মানদেরই নয়, পৃথিবীর এক বিশাল জনগোষ্ঠিকে হিটলারের প্রতি মোহমুগ্ধ করে রেখেছিলেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এমনকি বিজয়ী রুশ বাহিনী যখন বার্লিন নগরের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে কামান হানছে তখনও গোয়েবলস প্রত্যয়ী কন্ঠে বলে যাচ্ছেন, বার্লিন প্রাগ তৃতীয় রাইখের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং কখনোই তার পতন হবেনা
এসব ইতিহাস কারোরই অজানা নয়
১৯৪৫ এর এপ্রিলের শেষ আক্ষরিক অর্থেই হিটলার তার সহযোগীদের জন্য নিষ্ঠুর এপ্রিল রুশ বাহিনী বার্লিনকে ঘিরে রেখেছে আরেকদিক থেকে ধেয়ে আসছে আমেরিকান বৃটিশরা মাটির তলার বাঙ্কারে অবস্থান নিয়ে হিটলার তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিস্ফল যুদ্ধজয়ের কিন্তু যাদের উপর ভরসা করে তার এই চেষ্টা সেইসব নাৎসী জেনারেল, মন্ত্রী এবং নেতারা একের পর এক তাকে পরিত্যাগ করছেন বিভিন্ন অজুহাতে পালিযে যাচ্ছেন অথবা সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে রুশ-মার্কিন-বৃটিশদের সাথে যোগাযোগ করছেন এদের অনেকেই দক্ষিন আমেরিকার নাৎসী দরদী ব্যাংকগুলোতে জমিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা
একসময়ে যারা গ্যাসচেম্বারে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করতে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্বিচারে গণহত্যা চালাতে হিটলারকে উৎসাহিত করেছেন তারা তখন ভীতু ইঁদুরের মতো হিটলারের ডুবন্ত জাহাজ থেকে লাফ দিচ্ছেন গোয়েরিং, রিবেনট্রপ, হিমলার, ষ্টাইনার, কাইটেল, ইয়োডল- একের জন চলে গেলেন একেকদিকে
অবরুদ্ধ বার্লিনের বাঙ্কারে হিটলার তার প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের সাথে রয়ে গেলেন গোয়েবলস্ সঙ্গে স্ত্রী এবং ছোট ছোট ছয় ছেলে-মেয়ে
২৮ এপ্রিল রাতে হিটলার সেই অবরুদ্ধ বাঙ্কারেই বিয়ে করলেন ১৫ বছরের প্রণয়িণী ইভা ব্রাউনকে
৩০ এপ্রিল বিকাল সাড়ে তিনটায় হিটলার ইভা ব্রাউন আত্মহত্যা করলেন হিটলারের অন্তিম নির্দেশ অনুযায়ী তাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হলো
নাৎসী বাহিনীর বড়ো বড়ো জেনারেল, মন্ত্রী, হিটলারের নিজস্ব বাহিনী এস.এসের প্রধান হিমলারসহ সবাই আপন প্রাণ বাঁচাতে হিটলারকে ছেড়ে গেলেও যাননি গোয়েবলস্
গোয়েবলস্ তার নিজের মতাদর্শ,বিশ্বাস প্রপাগান্ডার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি থার্ড রাইখের সাথে, মৃত নেতার সাথেও
ইচ্ছে করলেই তিনি পারতেন অন্তত তার ছয় সন্তানকে নিরাপদ আশ্রযে পাঠিয়ে দিতে তখনও অনেকেই রাজি এই দায়িত্ব নিতে কিন্তু, হাজার হাজার বিপন্ন জার্মান শিশু যখন অবরুদ্ধ বার্লিনে মৃত্যুর সাথে পুতুল খেলছে তখন তিনি নিজের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য কাপুরুষতার পোশাক পরতে চাননি আবার শত্রুর হাতে ধৃত সন্তানদের অবমাননাও দেখতে চাননি
মে, ১৯৪৫ সাল পরম যত্নে সন্তানদের দুপুরের খাবার খাওয়ালেন মিসেস গোয়েবলস তারপর ছয় বাচ্চাকে ক্যান্ডির সাথে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দেয়া হলো শেষবারের মতো ঘুমিয়ে পড়লো তারা প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে এলেন গোয়েবলস পিছনে পিস্তল হাতে বিশ্বস্ত অনুচর একজন আরেকজনের ঠোঁটে শেষ বিদায়ের প্রগাঢ় চুম্বনরেখা টেনে দিয়ে তারদিকে পিছন ফেরে দাঁড়ালেন গোয়েবলস দম্পতি মাত্র দুটি গুলির শব্দ হলো চলে গেলেন আধুনিক প্রচারযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ নাম, ডঃ গোয়েবলস দল এবং নেতার দেয়া বিশ্বাসের মর্যাদা রেখে

কৃতজ্ঞতা: হিটলার/ সৈয়দ মুজতবা আলী

-----------------
মৃত্যু নাকি আত্মহত্যাঃ
চলন্ত ট্রামের সামনে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ

ড. মাহফুজ পারভেজ

আমার মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর? জানি না কি তাহা,
সব রাঙা কামনার শিয়ওে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ; একদিন পৃথিবীতে ম্বপ্ন ছিলÑসোনা ছিল যাহা
নিরুত্তর শান্তি পায়; যেন কোন মায়াবী প্রয়োজন লাগে।
কি বুঝিতে চাই আর? ...রৌদ্র নিভে গেলে পাখিপাখালির ডাক
শুনিনি কি? প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক!

                     [মৃত্যুর আগে, ধূসর পাণ্ডুলিপি]


১.
জীবনানন্দ দাশের (জ. ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯, মৃ. ২২ অক্টোবর ১৯৫৪)  বাল্য ও কৈশোর একেবারেই সাদামাটা। তাঁকে বলা যায় গ্রাম ও শহরের মিলিত প্রবাহে বেড়ে ওঠা প্রকৃত মফঃস্বলবাসী। তবে পরিবারটি ছিল সনাতন হিন্দু সমাজের চেয়ে অগ্রসর ও আধুনিক- ব্রাহ্ম ভাবানুসারী। কোনও রকম উচ্ছৃঙ্খলার অবকাশ নেই, শিশু-কিশোরদের দুরন্তপনাও বরদাস্ত করা হয় না, সর্বদাই হিতোপদেশ ও উচ্চ আদর্শের কথা আর নীতিবাগীশ পরিম-ল ঘিরে ছিল জীবনানন্দ দাশকে। জীবনানন্দের মা কবি হলেও ছেলে কিন্তু শৈশব বা কৈশোরে কবিতা লেখার কোনও চেষ্টাই করেন নি। মন দিয়ে লেখাপড়া করে গেছেন; পরীক্ষায় পাস করাই ছিল জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য; সাফল্যের সীমানা। এহেন বাধাধরা, ছকবদ্ধ জীবনানন্দ কবি হলেন, প্রেম ও বিষণ্ণ তার কবি এবং শৃঙ্খলার উল্টোপিঠে গিয়ে জীবন থেকে পালিয়ে আত্মহত্যাও (?) করলেন।
জীবনের শেষ পাদে কি ঘটবে, অন্য কারোও মতো খোদ জীবনানন্দও টেরটি পর্যন্ত পান নি; লক্ষী ছেলের মতোন কঠোর তপস্যায় পড়াশোনা করে যাচ্ছেন তিনি। বরিশাল থেকে আইএ পাস করে কলকাতায় এসে বিএ পাস করলেন প্রেসিযেন্সি কলেজ থেকে। হলেন ইংরেজির স্মাতক। সে সময়, প্রথমবাবের মতো একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল ব্রাহ্মদের কাগজে, অকিঞ্চিতকর লেখাটি কেউ গ্রাহ্যই করে নি। এবং এতে মায়ের প্রভাব লক্ষ্যণীয়। কলকাতার সাহিত্যিক দলের কাছেও বিশেষ কোনও কল্কে পান নি তিনি।
(১৯১৯ সালে কবি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ২য় শ্রেণীতে অনার্সসহ বিএ পাশ করেন। তখন তাঁর বয়স ২০। সে সময় ব্রহ্মবাদী পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা বর্ষ আবাহন‘ [ওইযে পূর্ব্ব তোরণ-আগে...] প্রকাশিত হয়। )
আত্মপ্রকাশের আদিলগ্নে দেখা গেলো জীবনানন্দ দাশের ওপর অনেকের প্রভাব। ঝরা পালক’-এর কবিতাবলিতে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাব বেশ প্রকট। সত্যেন দত্ত ছন্দের জাদুতে ও দেশীয় শব্দ প্রয়োগে তৎকালে অনেককেই প্রভাবিত করেছিলেন। কিন্তু একেবারেই সমবয়সী নজরুলের দ্বারা জীবনানন্দের প্রভাবান্বিত হওয়ার মতো দৃষ্টান্ত তুলনারহিত। নজরুল কি তাঁর সমবয়সী জীবনানন্দকে চিনতেন, কিংবা তাঁর কবিতা পড়েছেন? মনে হয় না, তেমন কোনও প্রমাণ নেই। কল্লোল গোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন লেখক, যেমন, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে নজরুলের যোগাযোগের কথা জানা যায়। কিন্তু জীবনানন্দ কল্লোল-প্রগতি পত্রিকায় লেখা শুরু করলেও তিনি ঠিক ওই গোষ্ঠীভুক্ত হন নি। নজরুলের কবিতায় অবশ্য জীবনানন্দশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে: আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।তবে, এটা নিছক শব্দ মাত্র। কেননা, ‘বিদ্রোহীকবিতা রচনার সময় জীবনানন্দ দাশ নামের কোনও কবির অস্তিত্বই ছিল না। তখনও তিনি গুপ্ত। দেখা হোক বা না হোক, জীবনানন্দ অবশ্যই নজরুলের লেখা পড়েছেন। কারণ তখন নজরুলের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা গগনস্পর্শী। ফলে প্রভাবিত হওয়ার প্রসঙ্গও যৌক্তিক। অথচ একই বছরে (১৮৯৯), একই দেশে, একই ভাষার পরিমণ্ডলে, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দুই জনের জন্ম।
জীবননান্দ শান্ত-শিষ্টভাবে পাঠ্যক্রম শেষ করে কলকাতার কলেজে চাকরি নিলেন এবং নিজের গ্রামের বাড়ি বরিশালের লোকজন ও জন্মস্থানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। পারিবারিক ও সামাজিক নিয়মনিষ্ঠায় তাঁর কোনওই কমতি ছিল বলা যাবে না। তখন পর্যন্ত যে কয়টি কবিতা তাঁর ছাপা হয়েছে, তা অকিঞ্চিতকর। ব্যক্তি হিসাবেও তাঁকে সুপুরুষ বলা যায় না। ব্যক্তিত্বও আকর্ষণীয় নয়। নারী সান্নিধ্য পেয়েছেন বলে জানা যায় না। তবে হালে ড. আকবর আলী খান বনলতা সেন’-এর যে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, তা অবশ্য অন্য তথ্য জ্ঞাপন করে। প্রকাশ্য জীবন ও জীবনীতে একেবারেই সাদামাটা জীবন বলতে যা বোঝায়, জীবনানন্দের ঠিক সে রকমের একটি জীবন লক্ষ্য করা যায়। বাধ্য ছেলের মতোন বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়েও করলেন একত্রিশ বছর বয়সে। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের জীবনে যেমন অনেক কিছু দ্রুত, নাটকীয় এবং চমকপ্রদ, জীবনানন্দের তেমনই সব কিছু ঢিমে তেতালায় এবং বর্ণহীন। সম্মান, সাফল্য, সম্বর্ধনা বা স্বীকৃতি জীবনানন্দ দাশের জীবনকালে বিরল ঘটনা। তিনি দারিদ্র সহ্য করেছেন আজীবন, খ্যাতি বা প্রতিষ্ঠাও জোটে নি বিন্দুমাত্র। আনুকূল্য বলতে যা চিহ্নিত হয়, সেটার দেখাও পান নি। তবু কী আশ্চর্য! বরিশালের এই অধ্যাপক লিখে যাচ্ছেন পাগলের মতোন; এমন কি ছাপা হবে কি হবে না, সে চিন্তাটুকুও তাঁর নেই। ভরিয়ে ফেলছেন খাতার পর খাতা: কবিতা, গল্প, উপন্যাসে। সব কিছুই নীরবে, নিভৃতে। মগ্ন প্রার্থনার মতো। তিনি যে অত লিখছেন, তা তাঁর ঘনিষ্ঠজনরাও টের পান নি। যেন সংগোপনে তৈরি হচ্ছেন  বিরাট কোনও স্বপ্ন সফলের জন্য; সফল হলেনও। আধুনিক বাংলা কবিতাকে তিনি নিয়ে গেলেন অদেখা এক স্বপ্নজগতে: হেমন্তের বিষণœতায়। সমসময়ের নির্জনতম কবি’  হিসাবে নিজেকে আর সকলের চেয়ে আলাদা করলেন। বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশকে নির্জনতম কবিএবং কোথাও আমাদের নির্জনতম কবিঅভিধায় চিহ্নিত করেছেন। জীবনানন্দের সমসময়ের অন্যতম প্রতিভা বুদ্ধদেব বসু এই নির্জন ও কোলাহলরহিত কবির প্রাথমিক মূল্যায়ন ও পর্যালোচনায় ব্রতী হন।
মৃত্যুতেও তিনি ছিলেন একজন অচেনা পথিক; ‘শুদ্ধতম কবিসমগ্র কাব্যের ব্যাখ্যায় অন্নদাশঙ্কর রায় জীবনানন্দ দাশকে অভিহিত করেছেন শুদ্ধতম কবিহিসাবে। আবদুল মান্নান সৈয়দ পরে এই নামে জীবনানন্দের কাব্যকীর্তি আলোচনা করে রচিত গ্রন্থের শিরোনাম দেন।
যে চুনিলাল ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় ট্রামের নিচে চাপা পড়ে থাকা জীবনানন্দকে উদ্ধার করেছিলেন; তিনি কবির জীবনীকার ক্লিন্টন বি সিলিকে জানান, হইচই শুনতে পেয়ে ঘটনা ঘটার মুহূর্তের মধ্যে সেখানে পৌঁছানোর পর দেখতে পান, কেউ একজন ট্রামের নিচে পড়ে আটকে আছেন। চুনিলালÑগাট্টাগোট্টা মানুষটিঝুঁকে পড়ে ট্রামের একপাশে দুই হাত লাগিয়ে পরিস্থিতির প্রয়োজনে অতিমানবীয় শক্তি প্রয়োগ করে ট্রামের একটা পাশ আলগা করে তুলে ধরেন, যাতে জীবনানন্দের শরীরটাকে টেনে বের করা যায়। চুনিলাল কবিকে সঠিকভাবে চিনতেন না। আসলে যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁদের সংখ্যাও অত্যল্প। কারণ, তিনি ছিলেন একান্ত একজন, যিনি প্রধানত থাকতেন কবিতার  ঘোরের মধ্যেই। জীবনানন্দকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছিলেন যে শুভাঙ্কাক্ষী বুদ্ধদেব বসু তাঁর উপযুক্ত সমাধিফলকই লিখে গিয়েছিলেন, যখন তিনি তাঁকে আমাদের নির্জনতম কবিবলে আখ্যায়িত করেছিলেন। হতে পাওে সেই নির্জনতার কারণেই আজ অবধি বাংলা সাহিত্যের এই মহৎ ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখা হয়েছে খুবই সামান্য। তাঁর জীবনীকারের মধ্যে গোপালচন্দ্র রায়, প্রভাতকুমার দাস, আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং ক্লিন্টন বি সিলি ছাড়া আর বিশেষ কারও নামোল্লেখ করা যায় না। তবে তাঁকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধের সংখ্যা ঈর্ষণীয় রকমের বেশি। তবে অধিকাংশই হয়েছে কবির মরণোত্তর কালে। নিজের নির্জনতাকে জীবনানন্দ নিজেও কী টের পেয়েছিলেন? এজন্যই কী আগেভাগেই বলে গিয়েছিলেন পরিসমাপ্তির বর্ণময় ব্যাখ্যা:
    সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
     সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
     পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
     তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;


এই নির্জনতা, এই একাকীত্ব, এই বিষণœতা, এমন কি অসহায় মৃত্যুর পূর্বাভাষ ছায়াপাত করেছিল তাঁর কবিতায়। ট্রামে-মৃত্যুর প্রায় ১৬ বছর আগে ট্রামলাইনের কথা লিখেছিলেন তিনি কবিতা:
    অনেক রাত হয়েছে- অনেক গভীর রাত হয়েছে;
     কলকাতার ফুটপাত থেকে ফুটপাতে- ফুটপাত থেকে ফুটপাতে-
     কয়েকটি আদিম সর্পিল সহোদরার মতো
     এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে
     পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে এদের বিষাক্ত বিস্বাদ স্পর্শ
     অনুভব করে হাঁটছি আমি।
     গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে- কেমন যেন ঠান্ডা বাতাস
     কোন্ দূর সবুজ ঘাসের দেশ নদী জোনাকির কথা মনে পড়ে আমার,-
     তারা কোথায়?
     তারা কি হারিয়ে গেছে?
     পায়ের তলে লিকলিকে ট্রামের লাইনমাথার ওপরে
     অসংখ্য জটিল তারের জাল
     শাসন করছে আমাকে।

জীবননান্দ কী তাঁর নিয়তির শাসনকে পাঠ করতে পেরেছিলেন পূর্বাহ্নেই? বেছে নিয়েছিলেন নিয়তি-নির্ধারিত পথ? তাঁর কী আত্মহত্যা না ইচ্ছামৃত্যু কোন গবেষকই সে ব্যাখ্যায় যান নি। আমরা শুধু দেখতে পাই, দিনান্তে ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলেছে অন্তর্গত হাহাকার আর অস্থিরতায় কম্পিত একটি চিল। তাঁর একাকিত্ব ও হতাশা এবং প্রকৃতির মধ্যে অণুর মতো তাঁর নিমগ্নতা তাঁকে তাঁর নামের প্রকৃত অর্থে বিপরীতে ঠাঁই দিয়েছে। বাংলা ভাষায় জীবনানন্দ শব্দটি উচ্চারিত হলে, শব্দটির আক্ষরিক অর্থ জীবনের আনন্দ’-এর স্থানে ভিড় করে ঝরা পালক’-এর বিষণ্ণ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে প্রবহমান কুয়াশাঘেরা-রহস্যময় এক বেদনার-জগত।   

          
২.
জীবনীকার ক্লিন্টন বি সিলি জানাচ্ছেন, (কলকাতার) রাসবিহারী চৌরাস্তা মোড় থেকে অল্প দূরত্বে ল্যান্সডাউন রোডের (পরে এই রাস্তার নাম হয়েছে শরৎ বোস রোড) এক ভাড়াবাড়িতে থাকতেন জীবনানন্দ আর তাঁর পরিবার। সেখান থেকে পাঁচ ব্লক দক্ষিণে রবীন্দ্রসরোবর, তার বিস্তৃত পার্কে জীবনানন্দ প্রায়ই হাঁটতে যেতেন একাকী। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় এ রকম সান্ধ্য ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। তখনই রাসবিহারী এভিনিউ পার হওয়ার সময় একটা চলন্ত ট্রামের সামনে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখানে চলন্ত ট্রামের সামনে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেনকথাগুলোর দিকে আমরা বিশেষ মনোযোগ দেবো। মনে রাখা দরকার, ক্লিন্টন হলেন জীবনানন্দের সবচেয়ে প্রামাণ্য, বিশ্বস্ত ও সর্বসাম্প্রতিক জীবনীকার। তিনি ষাটের দশকে দুই বছর বরিশালে ছিলেন। কিন্তু তখনো জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে নি, পরিচয় ঘটে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার পর। কবি সম্পর্কে তাঁর গভীর গবেষণালব্ধ তথ্য ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বিশ্লেষণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট। ২০১১ সালে ফারুক মঈনউদ্দীন গ্রন্থটি অনুবাদ করেন অনন্য জীবনানন্দ নামে। কবির মৃত্যু প্রসঙ্গে গ্রন্থের ভূমিকায় ক্লিন্টন  যে মন্তব্য করেছেন (চলন্ত ট্রামের সামনে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন’), তাতে কবির একটি সচেতন ভূমিকা রয়েছে। যেন তিনি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রামের সামনে চলে এসেছিলেন। গ্রন্থের শেষ দিকে ক্লিন্টন অবশ্য অন্য কথা বলছেন, ‘জীবনানন্দ রাস্তা পার হওয়ার শুরু করলে পশ্চিম দিক থেকে একটা ট্রাম এসে পড়ে এবং কোনো কারণে অন্যমনস্ক থাকায় তিনি সামনে পড়ে যান।এখানেও আমরা  কোনো কারণে অন্যমনস্ক থাকায়শব্দগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে পারি। লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে যে, ‘কোনো কারণে অন্যমনস্ক থাকায়আর চলন্ত ট্রামের সামনে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেনএকই অর্থ ও পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে না। ক্লিন্টন জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু সম্পর্কে পরিস্কার কোনও তথ্য জ্ঞাপন করতে পারেন নি; দুটি স্ববিরোধী অনুমান করেছেন মাত্র এবং অনুমান দুটিও তিনি গ্রন্থের পৃথক দু’টি স্থানে করেছেন পরস্পর-বিরোধীভাবে। কবিতার মতোই মৃত্যুতেও এই কবি রহস্যাবৃত। পশ্চিমী গবেষক সেটা ভেদ করতে পারেন নি। 


৩.
আহত জীবনানন্দ দাশকে ট্যাক্সিতে করে কলকাতার শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে কয়েকটা ভাঙা পাঁজর, চিড় ধরা কণ্ঠাস্থি ও চূর্ণবিচূর্ণ পায়ের চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতালে থাকার সময় তখনকার ডাক্তারির ছাত্র ডা. ভূমেন্দ্র গুহ ও তাঁর কয়েকজন সহপাঠী ছাত্র সার্বক্ষণিকভাবে জীবনানন্দের পাশে ছিলেন। সত্যপ্রসন্ন দত্ত কবির একদার প্রচন্ড বিরুদ্ধবাদী  সম্পাদক সজনীকান্ত দাসকে টেলিফোন করলে তিনি সত্যিকার গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে এমন ব্যবস্থা করেন, যাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় ব্যক্তিগতভাবে জীবনানন্দের ব্যাপারটা দেখেন। ডা. রায় পরদিন হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁর জীবন রক্ষার সব রকম চেষ্টাই করা হয়েছিল। কিন্তু জীবনানন্দ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন এবং ২২ অক্টোবর তারিখে দুর্ঘটনার আট দিন পর মারা যান। পরদিন ২৩ অক্টোবর দক্ষিন কলকাতার প্রাচীন কালীঘাট মন্দিরের পাশে কেওড়াতলা শ্মশানে কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নরেশ গুহ (কবিতা, পৌষ ১৩৬১), সঞ্জয় ভট্টাচার্য (কবি জীবনানন্দ দাশ), এবং গোপালচন্দ্র রায়ের (জীবনানন্দ) বরাতে ক্লিন্টন কবির জীবনাবসানের অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলেও আট দিনের চিকিৎসাকালীন সময়ে এই দূর্ঘটনাসম্পর্কে খোদ জীবনানন্দের কোনও বক্তব্য হাজির করতে পারেন নি। মৃত্যুশয্যায় কারা কারা কবির সঙ্গে দেখা করেন এবং কি কি বিষয়ে অন্তিম আলোচনা হয়, সে সম্পর্কেও কোনও গবেষক বিন্দুমাত্র আলোকপাত করতে পারেন নি। এতে প্রমাণিত হয়, কবি একজন অজ্ঞাত ও সাধারণ লোকের মত হাসপাতালের বেডে মারা যাচ্ছিলেন। এমন কি, যে কোনও দূর্ঘটনার সঙ্গে পুলিশী মামলা ও বিস্তারিত বিবরণের যে রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে; জীবনানন্দের ক্ষেত্রে সেটাও প্রতিপালিত হয় নি। জন্মের মাত্র ৫৫ বছর ৮ মাসের মাথায় জীবনানন্দের নীরব তিরোধান কালে কেউই স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি যে, এই নিভৃতবিষণ্ণকবি অচীরেই মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পাশে নিজের একটি স্বতন্ত্র জায়গা করে নেবেন এবং তিনি সমসময়ের অন্যদের চেয়ে আলাদা ও বৈশিষ্টপূর্ণভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবেন। এমন কি, তাঁর কাব্যরুচিকে ঘিরে তৈরি অনাগতকালের অগণিত কবি ও পাঠক জীবনানন্দ দাশ ও আধুনিক বাংলা কবিতার মধ্যে একটি সমান্তরাল পথরেখা খুঁজে পাবেন।
.........
১/ক্লিন্টন বি সিলি [২০১১: ১৩]; আবদুল মান্নান সৈয়দ [২০১১:১১]

=============
মাইকেলের মৃত্যকালীন সমাজচিত্র
মাহফুজ পারভেজ

২৯ জুন। সালটি ছিল ১৮৭৩। বিশিষ্ট কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুর দিন। মৃত্যুর ১৪১ বছর পর তৎকালীন সমাজ-সংস্কৃতির পটভূমির দিকে তাকালে স্তম্ভিত হয়ে হয়। ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, ১৮৭৩ সালের মার্চ মাস নাগাদ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ে। তাঁর স্ত্রী হেনরিয়েটার স্বাস্থ্যও নাজুক অবস্থার সম্মুখীন হয়। অপরিমিত মদ্যপান, চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় ছেদ, অমিতচারীতার ফল শরীর সইতে পারে নি। উত্তরপাড়া লাইব্রেরির ওপর তলায় আশ্রয় পেলেন কবি। রইলেন ছয় সপ্তাহ। উত্তরপাড়ায় কবির শরীর-স্বাস্থ্য ও কার্যকলাপের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে তাঁর উচিত ছিল, পাঠগৃহে নয়, চিকিৎসাস্থল আলিপুরের জেনারেল হাসপাতালে যাওয়া। কারণ এ সময়ে তিনি এবং হেনরিয়েটা, উভয়েই খুব অসুস্থ ছিলেন। কে বেশি অসুস্থ বলা মুশকিল হলেও সুস্থ্যতা দুজনের ধারে কাছেও ছিল না। এই সঙ্কুল সময়ে মাইকেল আরাম কেদায় বসে চোখ বুজে পড়ে থাকতেন। দেখলে মনে হতো, যেন একটি কঠিন হিসাব মেলাতে চেষ্টা করছেন। হায়! কী আশা করেছিলেন আর কী অর্জন করেছিলেন! সম্ভবত এ কারণেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের একমাত্র প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থের নাম তাঁর জীবনেরই মতো এবং তাঁর কবিতার উদ্ধৃতির মাধ্যমে বিধৃত: আশার ছলনে ভুলি’, যার লেখক গোলাম মুরশিদ।
মাইকেল যখন নিদারুণ অসহায় অবস্থায় উত্তরপাড়ায় বসবাস করছেন, তখন হাওড়ায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে বদলী হয়ে আসেন মাইকেল-বন্ধু গৌরদাস বসাক। তিনি এ সময়ে একাধিক বার উত্তরপাড়ায় গিয়ে মাইকেলকে দেখে আসেন। শেষ বার সেখানে তিনি যে দৃশ্য দেখতে পান, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি তার বিবরণ দিয়েছেন এইভাবে: মধুকে দেখতে যখন শেষ বার উত্তরপাড়া সাধারণ পাঠাগারের কক্ষে যাই, তখন আমি যে মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখতে পাই, তা কখনো ভুলতে পারবো না। সে সেখানে গিয়েছিলো হাওয়া বদল করতে। সে তখন বিছানায় তার রোগযন্ত্রণায় হাঁপাচ্ছিলো। মুখ দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছিলো। আর তার স্ত্রী তখন দারুণ জ্বরে মেঝেতে পড়েছিলো। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে মধু একটুখানি উঠে বসলো। কেঁদে ফেললো তারপর। তার স্ত্রীর করুণ অবস্থা তার পৌরুষকে আহত করেছিলো। তার নিজের কষ্ট এবং বেদনা সে তোয়াক্কা করে নি। সে যা বললো, তা হলো: 'afflictions in battalions.' আমি নুয়ে তার স্ত্রীর নাড়ী এবং কপালে হাত দিয়ে তাঁর উত্তাপ দেখলাম। তিনি তাঁর আঙুল দিয়ে তাঁর স্বামীকে দেখিয়ে দিলেন। তারপর গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নিম্নকণ্ঠে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন: আমাকে দেখতে হবে না, ওঁকে দেখুন, ওঁর পরিচর্যা করুন। মৃত্যুকে আমি পরোয়া করিনে।
বাল্যবন্ধুর অন্তিম দশা দেখে গৌরদাস স্বভাবতই বিচলিত বোধ করেন। তিনি তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে কলিকাতায় নিয়ে যেতে চাইলেন। জানা গেল, পরের দিন, ২০/২১ জুন (১৮৭৩), মধু নিজেই কলিকাতা ফেরার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সপরিবারে কবি বজরায় করে নৌপথে নির্ধারিত দিনে অসুস্থ শরীরে নিজ উদ্যোগেই কলিকাতা যাত্রা করলেন।
কলিকাতায় হেনরিয়েটাকে ওঠানো হলো তাঁর জামাতা উইলিয়াম ওয়াল্টার এভান্স ফ্লয়েডের বাড়িতে, ১১ নম্বর লিন্ডসে স্ট্রিটে। ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়া লিন্ডসে স্ট্রিট চৌরঙ্গি রোডের সঙ্গে সংযুক্ত। স্ত্রীর সংস্থান হলেও মাইকেলের নিজের ওঠার মতো কোনও জায়গা ছিল না। উত্তরপাড়ায় যাবার আগেই তিনি তাঁর এন্টালির বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন। অগত্যা মাইকেল ঠাঁই নিলেন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে। সে আমলে দেশীয় ভদ্রলোকগণ হাসপাতালে ভর্তি হওয়াকে কালাপানি পার হওয়ার মতো শাস্ত্রবিরুদ্ধ একটি অসাধারণ ব্যাপার বলে বিবেচনা করতেন। ফলে এই হাসপাতালটি ছিল মূলত বিদেশী এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য সংরক্ষিত। কিছু বিশিষ্টজনের তদবিরে এবং মাইকেলের নিজের সাহেবী পরিচয়ের জন্য তিনি অবশেষে এ হাসপাতালে ভর্তির অনুমতি পেলেন। হাসপাতালে আসার পর প্রথম দিকে শুশ্রুষা এবং ওষুধপত্রের দরুণ তাঁর রোগ লক্ষণের খানিকটা উপশম হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই তাঁর স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে এগিয়ে যায়। যকৃৎ, ¬ীহা এবং গলার অসুখে তাঁর দেহ অনেক দিন থেকেই জীর্ণ হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময়েই তাঁর যকৃতের সিরোসিস থেকে দেখা দিয়েছিল উদরী রোগ। সেই সঙ্গে হৃদরোগের লক্ষণও স্পষ্ট দেখা দেয়। সব মিলিয়ে তাঁর শারীর শেষ অবস্থায় এসে উপণীত হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বে একজন সাহেব-কবিঅকৃপণভাবে মধুভাণ্ড তৈরি করেছিলেন, যার স্বাদ পুরোপুরিভাবে তাঁর স্বজাতি গ্রহণ করতে অক্ষম হয়েছিল। বরং অবজ্ঞা ও সমালোচনায় জাত-ত্যাগীকবিকে ভর্ৎসনা করেছিল। সেই মধুনির্মাতা মধুকবি মারা যাচ্ছেন শুনে আলিপুর হাসপাতালে অনেকের ভিড় দেখা যায়। তাঁর চরম দুরবস্থার খবর শুনেও এতো দিন যারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল, তারাও এসে হাজির। রক্তের আত্মীয়তা সত্ত্বেও যারা একদা তাঁকে ধর্মের কারণে ত্যাগ করেছিল, তাদের মনেও হয়ত করুণা বা লোকলজ্জা হানা দিয়েছিল- তারাও এলেন। কবি তখন ভালো করেই অনুভব করতে পারছিলেন যে, তিনি মারা যাচ্ছেন; তবে ভালো হয়ে উঠবেন- এই স্বপ্নও তিনি দেখছিলেন। এরূপ বিপন্ন অবস্থাতেও তিনি বেহিসাবী স্বভাবের প্রভাবমুক্ত হতে পারেন নি। ধার করে হলেও ব্যয় করার এবং বদান্যতা দেখানোর প্রবণতা তিনি এ সময়েও ত্যাগ করতে পারেন নি। হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে একদিন দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর এক সময়ের মুন্সি মনিরউদ্দিন। কবির কাছে তাঁর চার শ টাকা পাওনা ছিল। তারপরেও উল্টো কবি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কোনও টাকা পয়সা আছে কি-না? মনিরউদ্দিন তাঁর কাছে মাত্র দেড় টাকা আছে বলে জানালেন। সেই পয়সাই তিনি চাইলেন। তারপর তা বকশিস হিসাবে দান করলেন তাঁর শুশ্রুকারিণী নার্সকে। মৃত্যুকালেও ধার করে বকশিশ দেবার এই আচরণ সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ তাঁর সারা জীবনের অভ্যাসের সঙ্গে।
কবি হাসপাতালে ছিলেন সাত অথবা আট দিন। এ সময়ে কিছু চিকিৎসা ও সেবা-যত্ন পেলেও কবি খুব একটা মানসিক শান্তিতে ছিলেন না। পরিবার সম্পর্কে তাঁর দুশ্চিন্তা এবং হেনরিয়েটার স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগ তাঁকে বিচলিত করে। এরই মাঝে হাসপাতালের শয্যায় শায়িত চরম অসুস্থ কবি এক পুরনো কর্মচারীর মাধ্যমে ২৬ জুন (১৮৭৩) একটি মর্মান্তিক বেদনার খবর পেলে- স্ত্রী হেনরিয়াটার মৃত্যুর সংবাদ। মাত্র ৩৭ বছর ৩ মাস ১৭ দিন বয়সে হেনরিয়েটা মারা গেলেন। হেনরিয়েটা বয়ঃসন্ধিকালে মা মারা যাবার পর থেকে সুখের মুখ কমই দেখেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত পরিবেশ ত্যাগ করে তিনি মাদ্রাজ থেকে কলিকাতা এসেছিলেন মাইকেলের ভালোবাসার টানে। চার্চে গিয়ে সেই ভালোবাসার কোনও স্বীকৃতি পর্যন্ত তিনি আদায় করতে পারেন নি। এমন প্রেয়সীর মৃত্যু সংবাদ কবির কাছে প্রচণ্ড আঘাত হয়ে এসেছিল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাইকেলের মুখ থেকে প্রথম যে কথাটি বের হয়: বিধাতঃ, তুমি একই সঙ্গে আমাদের দুজনকে নিলে না কেন?’ হেনরিয়েটার শর্তহীন ভালোবাসা এবং নীরব ত্যাগের কথা অন্য সবার চেয়ে মাইকেলই ভালো করে জানতেন। সুতরাং যতো অনিবার্য হোক না কেন, হেনরিয়েটার প্রয়াণে মৃত্যুপথযাত্রী কবি খুবই মর্মাহত ও বিষণœ হয়েছিলেন। এর ফলে তাঁর অসহায়ত্ব ও যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি খুবই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন হেনরিয়েটার শেষকৃত্যের ব্যাপারে। এর জন্যে যে অর্থ, যোগার-যন্ত্র লাগবে, তা কোথা থেকে আসবে ? তিনি সঞ্চয়ী লোক ছিলেন না। কপর্দকশূন্য অবস্থায় স্ত্রীর মৃত্যুতে মাইকেল তখন নিজেও মৃত্যু পথযাত্রী।
এই দিনই অথবা পরের দিন হাসপাতালে শয্যাগত মাইকেলের কাছে স্বজন মনোমোহন ঘোষ আসেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ও সান্ত্বনা দিতে। কবি তাঁকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেন, ঠিকমতো হেনরিয়েটার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছে কিনা। মনোমোহন জানালেন, সবই যথারীতি হয়েছে। মাইকেল জানতে চান, বিদ্যাসাগর ও যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এসেছিলেন কিনা। মনোমোহন জানালেন, এঁদের খবর দেওয়া সম্ভব হয় নি; অর্থাৎ আসেন নি। স্ত্রী বিয়োগের ফলে অসহায় কবির সামনে আরেকটি মারাত্মক উদ্বেগের কারণ এসে উপস্থিত হয়: দুই পুত্রের ভবিষ্যৎ চিন্তা। তাঁর পুত্রদের একটির বয়স তখন মাত্র বারো এবং অন্যটির মোটে ছয়।
ধর্মান্তরিত মাইকেলের অবস্থা এমন ছিল যে, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় এবং রেভারেন্ড চন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বরং কবির পারলৌকিক মঙ্গল নিয়ে কবির চেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। বিশেষত চন্দ্রনাথ কবিকে এ সময়ে বার বার নাকি পরম ত্রাতা যীশু খ্রিস্টের কথা মনে করিয়ে দেন। মাইকেল জীবনীকার গোলাম মুরশিদ লিখেন: পারলৌকিক মঙ্গলের ব্যাপারে তাঁদের এই উৎকণ্ঠা দিয়ে নিজেদের অজ্ঞাতে তাঁরা কবির প্রতি যথেষ্ট নিষ্ঠুরতা করেন বলেই মনে হয়।
২৮ জুন তারিখে সমস্ত আশা-ভরসাহীন, রোগকাতর, বিষণ্ণ কবি যখন কেবলমাত্র মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে আছেন, তেমন সময়ে চন্দ্রনাথের সঙ্গে এসে যুক্ত হন কৃষ্ণমোহন। উদ্দেশ্য: খ্রিস্ট ধর্ম অনুযায়ী কবির শেষ স্বীকারোক্তি আদায় করা। কবি কোন পাপের কথা স্বীকার করে বিধাতার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, এমন তথ্য কেউ জানেন না। এহেন পরিস্থিতিতে কৃষ্ণমোহন এবং চন্দ্রনাথ আশঙ্কা প্রকাশ করে কবিকে জানান যে, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং তাঁকে কোথায় সমাধিস্থ করা হবে, তা নিয়ে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। এমন আস্থাহীন অবস্থায় মাইকেলের নির্ভীক উত্তর ছিল: মানুষের তৈরি চার্চের আমি ধার ধারিনে। আমি আমার স্রষ্টার কাছে ফিরে যাচ্ছি। তিনিই আমাকে তাঁর সর্বোত্তম বিশ্রামস্থলে লুকিয়ে রাখবেন। আপনারা যেখানে খুশি আমাকে সমাধিস্থ করতে পারেনআপনাদের দরজার সামনে অথবা গাছ তলায়। আমার কঙ্কালগুলোর শান্তি কেউ যেন ভঙ্গ না করে। আমার কবরের ওপর যেন গজিয়ে ওঠে সবুজ ঘাস।
২৯ জুন ১৮৭৩, রবিবার, মাইকেলের অন্তিম অবস্থা ঘনিয়ে এলো। তাঁর হিতাকাক্সক্ষী এবং সন্তানার এলেন তাঁকে শেষ বারের মতো দেখতে। এমন কি, তাঁর যে জ্ঞাতিরা হিন্দু ধর্ম ত্যাগের কারণে তাঁর সঙ্গে সকল সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে মাত্র একজন এসেছিলেন তাঁকে দেখতে। জীবনের শেষ দুই বছর কবির নিদারুণ দুর্দশায় সহায়তার হাত প্রসারিত না করলেও, শেষ মুহূর্তে মৃত্যুপথযাত্রী কবিকে দেখে অনেকেই করুণায় বিগলিত হয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্রামহীন, আঘাতে-উদ্বেগে-পীড়ায় জর্জরিত এবং রোগশীর্ণ দেহ কবি আর ধরে রাখতে পারলেন না। বেলা দুটার সময়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন চিরদিনের জন্যে।
মাইকেলের ক্ষেত্রে মৃত্যুপরবর্তী ধর্মীয় কাজের সমস্যাজনীত আশঙ্কা প্রবলভাবে সত্যে পরিণত হলো। তাঁর মৃত্যুর পর সত্যি সত্যিই তাঁর শেষকৃত্য নিয়ে প্রচণ্ড সমস্যা দেখা দিল। যদিও মৃত্যুর শেষ বিদায়ে থাকার কথা ক্ষমা ও প্রার্থণা, মাইকেলকে সেটা থেকেও বঞ্চিত করা হলো। কলিকাতার তৎকালীন খ্রিস্টান সমাজ তাঁর দীক্ষার ঘটনা নিয়ে ঠিক তিরিশ বছর আগে একদিন মহা হৈচৈ করলেও, মৃত্যুর পর তাঁকে মাত্র ছয় ফুট জায়গা ছেড়ে দিতেও রাজি হলো না। ইংলিশম্যানের মতো পত্রিকাগুলো তাঁর মৃত্যুর খবর পর্যন্ত ছাপলো না। যদিও সে সপ্তাহে কলিকাতায় মোট কয় জন দেশীয় ও খ্রিস্টান মারা যান এবং আগের সপ্তাহের তুলনায় তা বেশি, না কম, সে পরিসংখ্যান নিয়েও পত্রিকাটি আলোচনা করে। মিশনারিদের কাগজ ফেন্ড অব ইন্ডিয়া  খুবই সংক্ষেপে তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছাপালো। সংবাদটি তাঁর কবি-কৃতির ধারে-কাছে দিয়েও গেল না, পত্রিকাটি গুরুত্বের সঙ্গে যা ছাপালো, তা হলো, তাঁর জীবন-যাপনের অভ্যাসগুলো ছিল অনিয়মে ভরা আর তিনি তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আরেকটি প্রসঙ্গ এ পত্রিকায় উলে¬খিত হয়েছিল- ‘তিনি তাঁর তিনটি সন্তানের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেন নি।
নবদীক্ষিত খ্রিস্টান মাইকেলের প্রতি খ্রিস্টান সমাজ যে মনোভাব দেখায়, তা দুঃখজনক এবং তাঁর পূর্বতন স্বজাতি হিন্দু সমাজের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের সঙ্গে তুলনীয়। তবে মৃত্যুকালীন আচরণ অভাবনীয় কঠোরতা আর ক্ষুদ্রতার পরিচয় বহন করে। কেননা, মৃত্যুর পরে মৃতের প্রতি এ রকমের রোষের ঘটনা ক্বচিৎ দেখা যায়। যাঁর সঙ্গে মাইকেলের কবিতার মিল না থাকলেও, ব্যক্তিগত জীবনে অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়, সেই শার্ল বোদলেয়ারের মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রতি অনেকের আক্রোশ প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর স্বীকারোক্তি-বক্তব্য নিয়ে, তাঁর কবি-কৃতি নিয়ে অনেকে বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যসাধকদের বেশির ভাগই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আসেন নি। কিন্তু ফরাসি সমাজ তাঁর মৃতদেহ সৎকারের ঘটনা নিয়ে এমন অমানবিক আচরণ করে নি, যেমনটি করা হয়েছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ক্ষেত্রে।
জুনের শেষ পাদে দারুন গ্রীষ্মের সময়ে মাইকেলের মৃত্যু হলেও, খ্রিস্টান সমাজ